আর্থিক নিরাপত্তা। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পরম আরাধ্য দুটি শব্দ। বিশাল শূন্যতার প্রতিচ্ছবিও। ক্রিকেট-ফুটবল বাদে অন্য খেলায় নিজেকে যারাই জড়িয়েছেন, আর্থিক সংকটকেও যেন আলিঙ্গন করে নিয়েছেন। তাই তো, ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে হয় তারা বাধ্য হচ্ছেন খেলা ছাড়তে, নয় তো সংকটের জীবনকে মেনে নিয়েই এগিয়ে চলছেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এটাই যেন নিয়তি। তবে একজন মানুষ একদল হতাশাবাদীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন। স্বপ্নটা ঘুরে দাঁড়ানোর, মাথা উঁচু করে বাঁচার। খেলাকে পেশায় বদলে দেওয়ার ব্রত নিয়ে হাজির নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। নিজে খেলোয়াড় ছিলেন বলেই অন্যের কষ্টটা বোঝেন। সেই বোধ থেকেই ঘোষণা দিয়েছেন সব খেলার জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সরকারের অর্থায়নে একটি বেতন কাঠামোয় নিয়ে আসবেন। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে বলেছেন নিজ নিজ জাতীয় দলের তালিকা জমা দিতে। রোজার মাসে সব তালিকা যাচাই-বাছাই শেষ করে ঈদের পরেই বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে চান দেশের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোলকিপার আমিনুল। যা নতুন করে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছে গোটা ক্রীড়াঙ্গনে। সবার একটাই কথা- মন্ত্রী যদি এ রকম উদ্যোগ সত্যি বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে এ খেলাধুলায় সামগ্রিক চিত্রটাই বদলে যাবে।
দেশকে পরপর দুটি এসএ গেমসে স্বর্ণপদক এনে দেওয়া মাবিয়া আক্তার সীমান্ত বর্তমানে চাকরি করেন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিতে সৈনিক পদে। সেখান থেকে মাসিক একটা বেতন পান ঠিক, তবে সেটা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। জাতীয় দলের ক্যাম্প চললে তিনবেলা খাবার বাবদ যে টাকাটা পাওয়ার কথা সেটা হাতে পান না। ফেডারেশন সেই টাকায় ভারোত্তোলকদের খাবারের ব্যবস্থা করে। ক্যাম্প যতদিন চলে হাতে মেলে কেবল লন্ড্রি ভাতা। একমাস চললে সেই অঙ্কটা ১০ হাজার টাকা। সেটা লন্ড্রি খাতেই বেশি অংশ খরচা হয়ে যায়। আমিনুলের ঘোষণায় ভীষণ খুশি মাবিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ওনার (আমিনুল) সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি। তবে দূর থেকে ওনার কথাগুলো শুনে ভীষণ আশাবাদী হয়ে উঠছি। আরও আগেই জাতীয় দলের ক্রীড়াবিদদের বেতনের আওতায় আনা উচিত ছিল। তবে অতীতে কোনো মন্ত্রী সেই উদ্যোগ নেননি। উনি এসেই ঘোষণা দিয়েছেন। যদি ক্যাটাগরি অনুযায়ী জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনা হয়, তবে সবাই খেলাটার প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হবে। আর্থিক নিরাপত্তা পেলে পরিশ্রমের পরিমাণও সবাই বাড়িয়ে দেবেন। তাতে আমার বিশ্বাস দেশের ক্রীড়াঙ্গনেই একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’
২০১৯ এসএ গেমসে আলোচনার বাইরে থেকে চমকে দিয়েছিলেন ফেন্সার ফাতেমা মুজীব। ফেন্সিংয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশকে স্বর্ণপদক উপহার দেওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই ফেন্সার মন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো একটা ঘোষণা করেছেন তিনি। খেলাধুলা যারা করে তাদের তো অন্য কোনো উপার্জনের জায়গা থাকে না। শুধু খেলার দিকেই ফোকাস দিতে হয়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে সেটাও ঠিকঠাক করা যায় না। যেহেতু স্যার নিজেও একজন খেলোয়াড় ছিলেন সেই জিনিসটা বুঝেই এমন ঘোষণা দিয়েছেন। আমি মনে করি যে কোনো একটা পর্যায় থেকে শুরুটা হওয়া জরুরি। জাতীয় দলের ক্যাম্প তো সবসময় থাকে না। তাই সরকারের কাছ থেকে যদি মাসিক বেতন পাওয়া যায়, তাহলে কেউই আগেভাগে খেলা ছাড়তে চাইবে না।’ ফাতেমা আরও বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর ধরে খেলাধুলা করছি। খেলাটাও অনেক বেশি খরচসাধ্য। আমার বা আমার পরিবারের পক্ষে সম্ভব না সকল ব্যয় নির্বাহ করে আমাকে খেলাতে। মন্ত্রী যদি বেতন কাঠামো গড়তে পারেন, তবে ভবিষ্যতে অনেকেই খেলার প্রতি আগ্রহী হবে।’
সম্প্রতি দিল্লিতে এশিয়ার শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন রবিউল ইসলাম টমাস। এই রাইফেল শুটার আমিনুলের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘(মাসিক বেতন) এটা যদি হয় তাহলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের চেহারাটাই বদলে যাবে। খেলায় মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খেলায় কোনো ক্যারিয়ার নেই। এই পরিস্থিতিতে যদি জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনা হয়, সরকারের কাছ থেকে স্থায়ী একটা সহযোগিতাটা যদি পাওয়া যায় তবে আমরা অনেক এগিয়ে যাব। জাতীয় দলের ক্যাম্পে কখনই আমরা কোনো বেতন পাইনি। এটা আমাদের জন্য বড় কষ্টের। মন্ত্রী যদি এটা বাস্তবায়ন করেন, তবে অনেক নতুন প্রতিভা উঠে আসবে। অভিভাবকরা তরুণদের বাধ্য করবে খেলায় আসতে।’
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল চ্যালেঞ্জে মিশ্র দ্বৈতে রুপা জিতে চমকে দিয়েছিলেন শাটলার আল আমীন জুমার। মূলত শীতের মৌসুমেই সারা দেশে আউটডোরে জমে ওঠে নানা ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা। তিন মাস সারা দেশে ঘুরে ঘুরে ব্যাডমিন্টন খেলে সারা বছরের খরচ তুলতে পারেন শাটলাররা। এবার শীত মৌসুমে তিনটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট থাকায় প্রত্যাশিত অর্থ উপার্জন করতে পারেননি শাটলাররা। এই আক্ষেপটা মন্ত্রীর ঘোষণায় অনেকটাই ঘুচেছে জুমারের, ‘খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনার ব্যাপারটা ভীষণ ইতিবাচক। নিশ্চয় জানেন, ব্যাডমিন্টন খেলাটা কতটা এক্সপেন্সিভ। এটা হলে অনেক প্লেয়ার যারা হতাশাগ্রস্ত, তারা খেলতে আগ্রহী হবেন।
বাংলাদেশের এ সময়ের অন্যতম সেরা কম্পাউন্ড আরচার বন্যা আক্তারও মনে করেন, মন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে ক্রীড়াঙ্গনে একটা বাঁকবদল ঘটবে, ‘আমরা দেশের জন্য খেলি। এটা অনেক গর্বের। তবে এর সঙ্গে যদি আর্থিক নিরাপত্তাটা থাকত, তবে আমরা আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতাম। এখন খেলার পাশাপাশি সংসার ও ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হয়। মন্ত্রী নিজে খেলোয়াড় ছিলেন বলেই আমাদের কষ্টটা বুঝতে পেরেছেন। তাই তিনি এমন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি তার সব উদ্যোগের সাধুবাদ জানাই ও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি।’
বেশিদিন হয়নি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আমিনুল। এর মধ্যেই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, প্রায় প্রতিদিনই ক্রীড়া উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছেন। তাতে, তাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে বাড়তি প্রত্যাশা। প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত চাপে বদলে গেলেই বিপদ। চাপের মুখে যে ভেঙে পড়ার শঙ্কাও আছে।
