নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসা মানেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে এমন বিশ্বাস করার মতো অবস্থা বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। অনেকে মনে করছেন, ভয়ের রাজনীতি আবার কিছুটা ফিরে আসতে শুরু করেছে। এ ধরনের রাজনীতি যত দ্রুত পুনঃপ্রবর্তন হবে, শাসকের জন্য নির্বিঘেœ জনরায় উপেক্ষা করে দেশ চালানো সহজ। কেউ কেউ বলছেন, ভয়ের রাজনীতি ফিরে আসতে পারে এই আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তা বোঝা যায় যখন ভারতের অন্যতম চেনামুখ বিনা সিক্রি বলেন, বিএনপি দুই-
তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর গণভোটের আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে একই কথা যখন আওয়ামী সুশীলদের মুখে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, তখন জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হওয়াটা স্বাভাবিক। এর পেছনে এ ছাড়াও একটা কারণ আছে। নির্বাচনের আগে কয়েকজন বিএনপি নেতার কার্যক্রমে বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ভোটপ্রাপ্তির বিনিময়ে তাদের ভবিষ্যতে নিরাপত্তা প্রদানসহ রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। হতে পারে এটা বিএনপির কোনো কোনো নেতার স্থানীয় রাজনীতির অংশ বা নির্বাচনী কৌশল। তবে এই বয়ানের বিপরীতে ভারতেরই কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন অন্য কথা। তাদের মধ্যে একজন বলছিলেন, বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, তাই এখন তারা ভাবতেই পারে এখন আর ভারতের সহযোগিতার তাদের দরকার নেই। জনগণের ম্যান্ডেডই এখন তাদের সাহস। এই সাহস বিএনপির সঙ্গে ভারতের কোনো মৌখিক চুক্তি হয়ে থাকলেও, বিএনপি তা অগ্রাহ্য করতে পারে বা নানা অজুহাতে ঝুলিয়ে দিতে পারে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে। যা বিএনপিকে তার আগের রাজনীতিতে ফিরে যেতে সাহায্য করবে। বিএনপি সেটা করতে পারে, কারণ বিএনপি জানে তার সমর্থকদের মধ্যে ভারতবিরোধী বীজ ব্যাপকভাবে রোপিত রয়েছে। তবে একটা পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল, এবার হয়তো কিছু একটা হবে। আবার শঙ্কাও ছিল, কারণ ফ্যাসিস্টকে হটানো হয়েছে, কিন্তু তাকে ধরা যায়নি। পালিয়ে গেছে লাগোয়া পাশের দেশে। সেই দেশ বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সুজন।
বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে যখন লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছিল সর্বনিকট প্রতিবেশী ভারত। কিন্তু ভারতের এক হাতে ছিল সহযোগিতা, অন্য হাতে ছিল বিনিময় হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া অসম চুক্তি। যাকে অনেকেই বলেন, ‘গোলামি চুক্তি’। খোদ আওয়ামী লীগের অনেক দেশপ্রেমিক নেতা ১৯৭১ সালেই সেটি মেনে নিতে পারেননি। সে অন্য এক ইতিহাস, যা প্রায় সবারই জানা। কিন্তু জন্মলগ্নেই বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের আধিপত্যবাদী অভিলাষকে কখনো লাশ বানানো যানি। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সেই অভিলাষ শতভাগ পূরণ হয় এবং জারি থাকে। এমন অবস্থায় ’২৪-এর ৫ আগস্ট হাসিনাকে রক্ষা করতে ভারত যে এগিয়ে আসবে, সে বিষয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ ছিল না। যে কারণে, ৫ আগস্টের আগে গুজব রটে শেখ হাসিনা পালিয়ে আগরতলা চলে গেছেন। গুজবের প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা নিজেই ১ আগস্ট দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না।’ শেখ হাসিনা তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গেলেও রেখে গেছেন নিজ হাতে গড়া অপেশাদার দলীয় প্রশাসন। এর ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। ৫ আগস্টের বিপ্লব কিংবা অভ্যুত্থানের পর চলতে থাকে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র। এসব ষড়যন্ত্রের কথা আঁচ করা গেলেও কিংবা পরবর্তীকালে সেটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে প্রমাণ করা গেলেও লাভ হয়নি। একসময় জুলাই স্পিরিট ক্রমে ফিকে হয়ে আসতে থাকে। নানা অপবাদে জুলাই বিতর্কিত হয়ে পড়ে। যদিও সেসব অপবাদের তথ্যপ্রমাণ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলছে মিডিয়া ট্রায়াল, কেউ বলছে এটাই সত্যি। আসল কথা হচ্ছে জুলাইয়ের স্পিরিট নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারাটাই ছিল ন্যূনতম লক্ষ্য। ষড়যন্ত্রকারীরা সেই লক্ষ্য অর্জনে শতভাগ সফল হয়েছে। তাদের আরেকটি সফলতা হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট বিরোধী শক্তির মধ্যে শক্তিশালী বিভাজন সৃষ্টি করা।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং বিপক্ষের শক্তি নিয়ে পুরনো তত্ত্বের এই বিভাজন বড় কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করতে না পারলেও, ভোটে বিএনপি যে লাভবান হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এটা কেউ অস্বীকার করবে না, বিএনপির বাক্সে যোগ হয়েছে ভিন্ন মতাদর্শের ভোট। কিন্তু সাধারণের ধারণা, বিএনপি অনায়াসে নির্বাচনে জয় লাভ করতো যদি সে তার পুরনো রাজনীতিই করত। কিন্তু বিএনপি সেটা করেনি, তারা জয়লাভ করলেও অযথা কিছু সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। কিছু কট্টর জাতীয়তাবাদী সমর্থক এবং এক্টিভিস্টকে হারিয়েছে; নতুন করে কিছু সমালোচনা এবং সমালোচকের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি বিএনপি যে অনুধাবন করতে পারেনি তা নয়। বিপরীতে বিএনপি তার শুভাকাক্সক্ষী সহায়তাকারী হিসাবে মাঠে নামিয়েছে আওয়ামী স্টাইলের পেটোয়া বাহিনী, সোশ্যাল মিডিয়ায় বটবাহিনী। এতে বিশেষ কিছু না হলেও ফ্যাসিস্ট আমলের ভীতিটা আবার কিছুটা ফিরে এসেছে। যা অনেকটাই চলে গিয়েছিল ৫ আগস্টের পর। নির্বাচনের আগ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যারাই বিএনপির কোনো কার্যক্রম নিয়ে কথা বলছে, তারাই বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। নির্বাচনের পর তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই বুলিং যখন বাস্তবে রূপ নেবে, তখনই প্রকৃত ভয়ের রাজনীতি পুনরায় কায়েম হতে পারে। এর মধ্যে বিএনপির ভেতর আরেকটি গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। এর চায় বিএনপির গঠনমূলক সমালোচনা। সেই গঠনমূলক সমালোচনাটা কী, সেটাও তারা পরিষ্কার করে বলতে পারেন না। তাদের কথায় যতটুকু বোঝা যায় তা হচ্ছে, গঠনমূলক সমালোচনা বলতে, একই দোষে দুষ্ট অন্য দলের কার্যক্রমকে সরাসরি নিন্দা করা এবং তাদের বিপক্ষে শক্তিশালী বয়ান তৈরি করা। যে কাজটা আসলে তাদেরই করার কথা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, একজন বিএনপির কট্টর সমর্থক কেন বিএনপির সমালোচনা করবে? তার মানে, সে আসলে গুপ্ত জামাত। এখন এই কথাটি খুব দ্রুত পল্লবিত হতে শুরু করেছে। জনগণ জানে, ব্যক্তি পরিবর্তন সহজ। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন সবচেয়ে কঠিন। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা, দল এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যেই দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এখন যদি নতুন সরকার সত্যিই আলাদা হতে চায় তাহলে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত জুলাইয়ের স্পিরিট এবং সংস্কার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বচ্ছ করতে হবে। নির্দিষ্টভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছে যে বিষয়গুলো সাধারণের কাছে কাক্সিক্ষত, সেগুলো হচ্ছে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ফ্যাসিস্টের বিচার, সব গুম-খুন ও বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দুর্নীতি দমন। এগুলোর ক্ষেত্রে বিএনপির মনোভাব এবং ভূমিকাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদিও সংস্কার নিয়ে বিএনপি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে মনে হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অনীহা হয়তো প্রকাশ্যে রূপ নেবে, যাকে রিপ্লেস করবে রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা। এই বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বিরোধী জোটের সঙ্গে। যদি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আর্থিক খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ না হয়, তাহলে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি খুব দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে, বড় বড় ভিশন বা দীর্ঘমেয়াদি টার্গেট ঘোষণা করা সহজ। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, মানুষের হাতে চাকরি আসবে? মূল্যস্ফীতি কমবে? টাকার মান স্থিতিশীল থাকবে? ব্যাংকিং খাতে লুটপাট বন্ধ হবে? যদি এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বাস্তবে ইতিবাচক না হয়, তাহলে যেকোনো বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে। আসলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে, প্রাণখুলে সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী মানুষকে যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে কাছে পাবেন। পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির নতুন দেশাত্মবোধে একাত্ম হতে হবে। দলীয় রাজনীতি থাকবে, কিন্তু সবার আগে দেশ। আমরা যেন এটি ভুলে না যাই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক সহনশীলতা। নির্বাচনে বিজয়ের পর তারেক রহমান বিরোধী নেতাদের বাসায় শুভেচ্ছা সফরকে শুভ সূচনা হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এই একটি ঘটনাকে দিয়ে ভবিষ্যতের চিত্র বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়, যা এখনো চালু আছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবার একেবারেই কাম্য ছিল না। কিন্তু তারপরও হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনে পুরনো বয়ান, পুরনো কৌশল, যা সাধারণের কাছে অগ্রহণযোগ্য স্মৃতি হিসাবে সংরক্ষিত আছে, সেটি ব্যবহারে খুব একটা কাজ হবে না। এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সব সময়ই বেশি থাকে, কিন্তু বাস্তবায়ন কম হয়। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এসব ছাড়া, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যদি এই খাতগুলোতে বাস্তব সংস্কার না আসে, তাহলে উন্নয়নের দাবি দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখন এমন একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জনগণ আর রাজনৈতিক ভাষণ বা আবেগের রাজনীতি চায় না। তারা ফলাফল চায়। আগামী পাঁচ বছর নির্ধারণ করবে, দেশ কি সত্যিকারের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দিকে যাবে, নাকি শুধু ক্ষমতার মুখ বদলাবে? জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনে, সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের ‘অভয়’ শব্দ প্রয়োগ কৌশলে হাস্যরসের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সেই আশঙ্কা দূর হওয়ার আশ্বাস চেয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া, সামাজিক মেলামেশা, মিডিয়ায় মানুষ যদি তাদের অভিযোগ, অনুযোগ তুলে ধরতে পারে এবং একই সঙ্গে মিডিয়াও যদি অভয়ের সঙ্গে তা প্রচার করতে পারে তাতে দেশের লাভ হবে। তবে মিডিয়া যদি, কোনো বিশেষ মহলের মিডিয়া ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাতে নিরপরাধ রাজনৈতিক দল, নেতা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাতে পরোক্ষভাবে গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করবে। গত ১৭ বছর মিডিয়া নিয়ে মানুষের মধ্য যে বিশ্বাসহীনতা গড়ে উঠেছে, যার অধিকাংশই ভিত্তিহীন নয় বলে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। তার মানে হচ্ছে, আমরা যে সুস্থ রাজনীতি চাই, সেটি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কারও একার নয়। তবে প্রথম উদ্যোগ আসতে হবে, সরকারি দল থেকে। তারপর বিরোধী দল এবং সবশেষে দায়িত্বশীল মিডিয়া। এতকিছু একদিনে অর্জন করা সম্ভব নয়। যেহেতু আমাদের অধিকাংশই এটিকে অর্জন করতে চাই, তাই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও চিকিৎসক
