কিশোর বয়সকালটি মূলত নিজেকে গঠনের। নবীন চোখে পৃথিবী নব নবরূপে মেলে ধরে একজন কিশোরের সামনে। পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে তার আচরণ কেমন হবে তা তাকে শিক্ষা দেয়, পরিবার, পরিবেশ বা চারপাশ। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরেও যে বিশাল পৃথিবী রয়েছে তার সম্পর্কে জানতে হলে তাকে পড়তে হয় বই। এখন প্রশ্ন হলো, অথ্যপ্রযুক্তির এই অবিস্মরণীয় বিপ্লবের সময়ে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অন্তর্জালের সাহায্যে তথ্যভা-ারে সাঁতার দেওয়া যায় তখন জানার জন্য বই পড়া কি এখনো প্রাসঙ্গিক?
কোনো দ্বিধা ছাড়াই এর উত্তর হলো, হ্যাঁ! একজন কিশোরের জন্য পৃথিবীকে জানার জন্য বইপড়া এখনো প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, কোন বিষয়টি পরিবার, সমাজ ও নিজের জন্য উপকারী, কোন বিষয়টি ক্ষতিকর সেগুলো জানার আগে, বোঝার আগে অন্তর্জালের অবাধ স্বাধীনতা কিশোরদের নিজেদের এবং দেশ-জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তা ছাড়া সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ভিত্তি শক্ত হওয়ার আগে মুক্ত অন্তর্জালে প্রবেশ করলে পথ হারানোর ভয় থাকে। সে ক্ষেত্রে কিশোরদের জন্য লিখিত বই তাদের প্রভূত সাহায্য করতে পারে। সে জন্য সবসময় কিশোরদের বই পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাদের উপযোগী বই তাদের এবং অভিভাবকদের নজরে আনার জন্য নানা সময়ে সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে বই পরিচিতি। সুলেখক মোরশেদ শফিউল হাসানও কিশোরদের উপযোগী বইয়ের আলোচনা লিখেছেন। সেই আলোচনাগুলো শুধু বইয়ের বা লেখক লেখনশৈলীর সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বইটির বিষয়বস্তু নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। স্বাদু গদ্যে সংক্ষিপ্তাকারে বইয়ের বিষয়বস্তু বলে ধরেছেন কিশোর পাঠকদের সামনে। তার গদ্যালোচনার মাধ্যমেই ওই কিশোর পাঠক যেন বইটি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে সে প্রচেষ্টা সেই বই আলোচনার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘদিনের সেই লেখাগুলোর একটি সংকলন ‘জানতে হলে পড়তে হবে’।
এই বইটিতে মোট ষোলোটি শিরোনামে ষোলোটি বই নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। শিরোনামগুলো হলো হেলেন কেলারের জীবনকাহিনি, অবন ঠাকুরের আপন কথা, গ্রিস ও ট্রয়ের উপাখ্যান, বাঙলা নামে দেশ, আমাদের ভাষার লড়াই, জয়নুল আবেদিন, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, ছানার মুক্তিযুদ্ধ, পৃথিবীর ইতিহাস, স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ, জীবনের শেষ নেই, সত্যজিৎ রায়ের ছোটবেলা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, আবিষ্কারের কথা, গোর্কির মা, স্মৃতির শহর ঢাকা।
শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট হয় যে, কিশোরমানস যেন একটিমাত্র বিষয়ে আবদ্ধ না হয়ে যায় বরং নানা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং জানতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই লেখক তার আলোচ্য বইগুলো নির্বাচিত করেছেন।
এই বই আলোচনায় যেমন প্রকৃতি ও নিয়তির বিরুদ্ধে অনবরত লড়াই করা মহাজীবনের বর্ণনাকারী বই, যেমন হেলেন কেলার লিখিত ‘আমার বিচিত্র জীবন কাহিনি’ বইয়ের অনুবাদগ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত তেমনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পী এবং সত্যজিৎ রায়ের মতো চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিকের আত্মজীবনীও স্থান পেয়েছে। আর কে না জানে, মহৎ ব্যক্তিদের আত্মজীবনী বা জীবনী পড়ার মাধ্যমেই মানুষের মনে উন্নত ও মহৎ জীবন গঠনের বাসনা উপ্ত হয়। হেলেন কেলারের জীবন তাদের শেখাবে নিয়তির কাছে হার না মানতে আর জয়নুল আবেদিন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়ের মতো মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী তাকে অনুপ্রেরণা জোগাবে সত্য ও সুন্দরের সাধনা করতে।
আমাদের দেশ ও জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কিশোদের সচেতন করতে লেখক অন্তর্ভুক্ত করেছেন আলী ইমামের ‘বাঙলা নামে দেশ’, বদরুদ্দীন উমরের ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ ও রফিকুল ইসলামের ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ বই যুক্ত করেছেন।
তবে দেশ ও পৃথিবী বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ নয়। রবীন্দ্রনাথ দেশের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা...’, তা ছাড়া এই বৈশ্বিক গ্রামের একজন সদস্য হিসেবে পৃথিবী ও মানবজাতির ইতিহাস জানাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই লেখক যুক্ত করেছেন ‘গ্রিস ও ট্রয়ের উপাখ্যান’, জওহরলাল নেহরু রচিত ‘পৃথিবীর ইতিহাস’, হাওয়ার্ড ফাস্টের ‘স্পার্টাকাস’-এর মতো বইয়ের স্বাদু অনুবাদ বই যুক্ত করেছেন।
মানবজাতির ইতিহাস শুধু যুদ্ধবিগ্রহ আর অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস নয়, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা আর আবিষ্কারের মাধ্যমে সভ্যতা বিনির্মাণের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্যই আবদুল্লাহ আল মুতী রচিত আবিষ্কারের নেশায় বইটি।
বই আলোচনাগুলো পড়ে যে কিশোর পাঠকরা বইগুলো উৎসাহিত হয়ে পড়েছে নিঃসন্দেহে তাদের মনোজগৎ পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং একই ধারা অন্যান্য বই পড়তে উৎসাহিত হয়েছে। মোরশেদ শফিউর হাসানের এই বইটি সেজন্য একটি রতœাধারই বটে, যেখানে ষোলোটি মূল্যবান রতœ রাখা আছে। এই বইটি পড়ে তোমরা উল্লিখিত বইগুলো পড়তে উৎসাহিত হবে সেই আশা রাখছি।
সুলতানা রাজিয়া