দেশের স্বাস্থ্যসেবায় সামগ্রিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বেশ স্পষ্ট। কিন্তু বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মান ও সবার জন্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য এবং সে জন্য বিনিয়োগ ব্যর্থতা আরও বেশি স্পষ্ট। যা পীড়াদায়ক ও নেতিবাচক। অপ্রতুল অর্থায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি, সীমিত সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার, অপচয় এ রকম হাজারো কারণ আছে, গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় দেখতে না পাওয়ায়। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার যেখানে ত্রাহি অবস্থা, সেখানে আলাদা করে দেশের একটি অঞ্চলের কথা বলা আপাত দৃষ্টিতে বাহুল্য মনে হতে পারে। তবে এলাকাটি যদি হয় দেশের উত্তরাঞ্চল, তখন খানিকটা আলাদা মনোযোগ দাবি করাই যায়। কারণ এ এলাকার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র জাতীয় চিত্রের চেয়েও বিবর্ণ এবং নানা হিসেবেই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক চিত্রের চেয়েও অধিক বিপর্যস্ত ও হতাশার।
রংপুুর বিভাগের মানুষের স্বাস্থ্য কেমন আছে, ছোট একটা তথ্যে তার একটা বড় নির্দেশক হাজির করা যেতে পারে। কোনো একটি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য কেমন আছে, তা অনুধাবন করার একটি শক্তিশালী নির্দেশক হলো ওই দেশ বা এলাকার মানুষের গড় আয়ু। বাংলাদেশের একজন পুরুষের গড় আয়ু ৭৪ বছর, অথচ রংপুরে পুরুষের গড় আয়ু ৭০.৬ বছর। বাংলাদেশের নারীদের গড় আয়ু যেখানে ৭৭ বছর রংপুরে সেটা ৭২.৬ বছর। ছোট এই তথ্যটি থেকেই রংপুর বিভাগের মানুষের স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ আছে, কিন্তু সেই উদ্যোগগুলো অপ্রতুল। এখনো স্বাস্থ্যসেবাকে এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে, তাদের প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী যথাযথভাবে নিয়ে যাওয়া যায়নি। সরকারের বিদ্যমান বিভিন্ন উদ্যোগে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণও এই এলাকায় এখনো অনেক পিছিয়ে। জাতীয় পর্যায়ে যেখানে ৫৯ শতাংশ নারী অন্তত চারবার গর্ভকালীন সেবা নেন, সেখানে রংপুরে এ হার মাত্র ১৪ শতাংশ!
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান প্রতি ১ হাজার জনের জন্য হাসপাতালের ৩টি বেড। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১ হাজার জনের বিপরীতে বেড সংখ্যা ১-এরও কম, ০.৯২। উত্তরবঙ্গের, তথা রংপুর বিভাগে প্রতি ১ হাজার জনের জন্য বেডের সংখ্যা আরও কম, প্রায় ০.৮। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, যা কিনা এই এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসাকেন্দ্র; সেখানে প্রায় ১৭ হাজার জনের জন্য আছে একটি বেড। আর যে কটা বেড এখানে আছে সবসময়ই রোগী থাকে তার প্রায় দ্বিগুণ। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে এই হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে অপেক্ষা করতে হয় ২ থেকে ৩ দিন। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশাজীবীর সংখ্যা রংপুর বিভাগে অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আদর্শ মান হলো, প্রতি ১ হাজার জনের জন্য একজন চিকিৎসক। আর বাংলাদেশে প্রতি হাজারের জন্য গড়ে চিকিৎসক আছেন ০.৬১ জন। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ১ চিকিৎসকের বিপরীতে জনসংখ্যা হলো প্রায় ১৩ হাজার! অর্থাৎ জাতীয় অবস্থার চেয়েও রংপুর বিভাগ পিছিয়ে আছে প্রায় ১৩ গুণ। আর এ কারণেই এই এলাকার পাঁচ ভাগের এক ভাগ মানুষ চিকিৎসাসেবার জন্য কোনো স্বীকৃত এমবিবিএস ডাক্তারের সেবা পেয়ে ওঠেন না, তারা বরং এর জন্য নির্ভর করেন গ্রাম্য ডাক্তার নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর। রংপুর বিভাগে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পর্যাপ্ত চিকিৎসকেরও অভাব। শুধু তাই না, নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় ভীষণ অপ্রতুল এ বিভাগে। বাংলাদেশে প্রতি ১৭৮৫ জনের জন্য একজন নার্স আছেন, অথচ রংপুর বিভাগে ১ জন নার্স আছেন প্রতি ২৫ হাজার মানুষের জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে, প্রতি ১ জন ডাক্তারের জন্য ৩ জন নার্স থাকার, সেখানে রংপুরের অবস্থা প্রায় বিপরীত। এখানে প্রতি দুজন ডাক্তারের জন্য আছেন ১ জন নার্স। শুধু কয়েকটা হাসপাতাল আর কিছু ডাক্তার-নার্স নিয়োগ দিলেই কি রংপুরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নত হয়ে যাবে? সাধারণ মানুষ কি কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্য সেবা পাবে? দুটো প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো না। প্রয়োজন আরও সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যান্য আরও পদক্ষেপের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যও উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য সবসময়ই একটা বড় বাধা। গবেষণায় দেখা গেছে, অতি দরিদ্র মানুষ অন্য যেকোনো শ্রেণির মানুষের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। দারিদ্র্যের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সম্পর্কটি একটা প্রমাণ আছে রংপুর মেডিকেল কলেজের ওপরই পরিচালিত এক গবেষণায়। এতে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে প্রসবকালীন জটিলতায় মৃত্যু হওয়া মায়েদের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই দরিদ্র।
রংপুরের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নকে টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে, দারিদ্র্য বিমোচনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন হলেও, দারিদ্র্য দূর করা যাচ্ছে না। দূর করা যাচ্ছে না নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অসংগতি। আমরা এমন কিছু উদ্যোগ নিচ্ছি, যা আসলে এ অঞ্চলের মানুষের দরকার নেই, অথবা খুব কার্যকর কোনো উদ্যোগ হয়তো নেওয়া হলো। কিন্তু এর সঙ্গে দরিদ্র মানুষদের, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ঠিকভাবে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। ফলে আসছে না, কাক্সিক্ষত ফলাফল। আপাত দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পৃক্ত করাটাকে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু জাতিসংঘ এবং বিশ্ব ব্যাংক বেশ স্পষ্টভাবেই জলবায়ু পরিবর্তন বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেছে। দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন করে তুলতে পারে, বাড়িয়ে দিতে পারে বিদ্যমান বৈষম্য। উত্তরবঙ্গ দেশের অন্যতম জলবায়ু বিপন্ন এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা নেতিবাচক প্রভাব দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে, আবার এই দারিদ্র্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি করছে বাধা। ফলে এখানকার স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের ক্ষেত্রে, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে জোরালোভাবে। উত্তরবঙ্গের মানুষ আসলে ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
লেখক : উন্নয়নকর্মী প্রধান, সামাজিক উন্নয়ন বিভাগ আরডিআরএস বাংলাদেশ
