এটা যে নতুন ফেনোমেনা, তা কিন্তু নয়। অনেক পুরনো। সেই পুরনো পদ্ধতির নামই নতুন মোড়ক পেয়েছে ‘মব’। আসলে এটি হচ্ছে বিক্ষোভ করে, কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অপসারণ ও নিগৃহীত করা। বিষয়টি বাইরের মানুষের কারবার ছিল এক সময়, পরে তা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে, বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির নাম নিয়ে। অফিসার ও কর্মচারীদের ওই সমিতির নেতারাই হয়ে ওঠেন সেই প্রতিষ্ঠানের বিকল্প ক্ষমতার মানুষ। এদের আবার ‘সিবিএ’ নামে চেনানো হয়। গঠন করা হয়, কেন্দ্রীয় ফেডারেশন। মানে একটি চেইন অব অর্ডার নির্মিত হয়। ফেডারেশন যে সব কর্মসূচি নেবে, নিচের লেভেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা পালন করবে। এ-এক বাহারি দুনিয়া। ক্ষমতার রসটুকু এরাই ভোগ করেন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। এই লেখা তৈরির পেছনে রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পাল্টানো অতিসাম্প্রতিক ঘটনা থেকে। সাদা চোখে মনে হয় যে, গভর্নরের চুক্তি বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগ করেছে সরকার। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি ঘটানোর পেছনে রয়েছে আরও ঘটনা। এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উপদেষ্টাকে ঘেরাও করে রেখে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনা জানার পর, গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অফিস ছেড়ে চলে যান। তারপরই নতুন গভর্নর হিসেবে যোগ দেন, মোস্তাকুর রাহমান। তিনি কস্ট ম্যানেজমেন্টের লোক। মনসুরের মতো অর্থনীতির নন। আমরা ধারণা করেছিলাম যে, কোনো অর্থনীতিবিদই এবার গভর্নর হবেন। কিন্তু সে ধারণা ভেঙে, একজন কস্ট ম্যানেজমেন্টের লোককে গভর্নর করায় একটু খটমট লাগছে। অতীতে ব্যাংকাররাই অগ্রগণ্য হতেন। কিংবা হতেন ইকনোমিস্টের অধ্যাপক, ইকনোমিস্ট, সেই ধারাস্রোত পাল্টে গেল। কথা উঠেছে, মোস্তাকুর একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালাতে দিলে, কী হতে পারে, সেটা নিয়োগ পাওয়ার একদিন পরই টের পাওয়া গেছে। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০০০ কোটি টাকার তহবিল দিয়েছেন। ওই তহবিল জ্বালানি সংক্রান্ত কাজে ব্যয় হবে। খবর এইটুকুই। তবে বড়শি হিসেবে প্রত্যেক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, এই ব্যাংকের মালিক বা চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু এমপি। এই বড়শি গাঁথবার কারণ, অতীতে যে মুখ পুড়েছে রাজনীতির প্রভাবের কারণে, সেই মুখে তো দইও ভালো লাগে না। পোড়া মুখে দইও অসহ্য।
২. ১৯৯৬ সালে আটক রাখা হয়েছিল গভর্নর খোরশেদ আলমকে। ২০০৯ সালে অবরুদ্ধ ছিলেন গভর্নর সালাহউদ্দিন আহমেদ। একজন গভর্নরের শার্টের কলার ধরেছিলেন সালমান এফ রহমান। এ-ছাড়াও আরও বহু ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এই সব ‘মব’ সংস্কৃতি মূলত দাবি আদায়ের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু একটি স্পর্শকাতর জাতীয় প্রতিষ্ঠানে কীভাবে ক্লাব-সমিতি গড়ে উঠল, তার আইনি ভিত্তি আছে কি নেই, সরকারের কোন কর্র্তৃপক্ষ ওই সব ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে, তার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি আছে কি না, কেউ তা খতিয়ে দেখছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন নানা ধরনের আন্দোলন, দাবি উত্থাপনের জন্য অনেকগুলো সমিতি ও ক্লাব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ইস্যুতে এসব সমিতির ব্যানারে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করে থাকেন। তাদেরই একটি অংশ, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নেতৃত্বে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব মিলিয়ে ৯টি ক্লাব ও সমিতি থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। ক্যাশ অফিসারদের জন্য রয়েছে, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। এ ছাড়া সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব। প্রতিবছর বা দুই বছরে একবার এসব সমিতির নির্বাচন হয়ে থাকে। এ ছাড়া রয়েছে হলুদ, সবুজ ও নীল দল। এসব মূলত রাজনৈতিক দল–সমর্থিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নীল দল পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কর্মকর্তারা, সবুজ দল চালান বিএনপি-সমর্থিত কর্মকর্তারা। আবার হলুদ দলে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত কর্মকর্তারাও আছেন। তারা দলের ব্যানারে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ক্লাবের নির্বাচনে অংশ নেন। এ ছাড়া কর্মচারীদের জন্য রয়েছে জাতীয়তাবাদী ফোরাম। আরও রয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও জিয়া পরিষদ। (প্রথম আলো/২৭ ফেব্রুয়ারি, ২৬)
দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে এই ধরনের ক্লাব-সমিতিই মূলত সরকারি-বেসরকারি দলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মব সৃষ্টি করছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বিশ্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। এ-বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে সরকারকে। যারা বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি নিতে যান তারা জানেন, এই প্রতিষ্ঠান কেপিআই, এখানে কোনো রকম রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো যাবে না। নিজেদের পদোন্নতির জন্য বিক্ষোভ দেখানো বেআইনি। তারপরও তারাই সমিতি/ক্লাব ইত্যাদি গড়ে এটাই প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সরকারই এই অপকর্মের হোতা। দলদাস সৃষ্টি করে জাতির অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এই মননের উপস্থিতি সামগ্রিক ব্যবস্থাকে ‘কর্ম-বিরোধী’ করে ফেলেছে। অতীতে একবারমাত্র মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তখন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আমল। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ব্যাংকের কাজের পরিবেশ নস্যাৎ করেছিল, গভর্নরের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেছিল, সেই সব সিবিএ নেতাদের অপরাধের জন্য চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজ দলের হলেও, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন তিনি। জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বরখাস্ত হন। এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কি সেই রকম ব্যবস্থা নেবে? নাকি সিবিএ নেতারা রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গভর্নরের একজন উপদেষ্টাকে ঘাড় ধরে বের করার মতো অসৌজন্যমূলক অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন? এর দুটি দিক আছে। এক. সিবিএ বা সমিতি/ক্লাবের নেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা উল্টো বিক্ষোভ দেখাতে পারেন, সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে পারেন, গণতান্ত্রিক পথকে কণ্টকিত করার অভিযোগ করতে পারেন এবং এটা বলতে পারেন, এই সরকার আদৌ মতপ্রকাশে বিশ্বাস করে না।
৩. বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের মতো কঠোর মনোভাব নিয়ে, কেপিআই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কর্তৃপক্ষ। আবার এটাও ভাবতে পারেন যে, ওই মব সৃষ্টিকারীরা তো আমাদেরই রাজনৈতিক পারপাস সার্ভ করেছে, অতএব সব অন্যায়ই ঠিক আছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন উঠে আসবে যে, ওই অপরাধমূলক পরিস্থিতির জন্য যারা দায়ী তারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য ছাড়পত্র পেয়ে যাবেন। যে কোনো স্বার্থ উদ্ধারে সিবিএ নেতাকর্মীরা ঘোট পাকিয়ে দাবি আদায়ে ব্যস্ত থাকবেন। বলেছিলাম ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ সেটাই প্রমাণিত হবে। এখন সরকার এ-ব্যাপারটি কানে নেবে, নাকি কানে তুলো দিয়ে থাকবে? অতীতে যদি এই রকম দৃষ্টান্ত থাকে, তাহলে কি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে অপমানের জন্য ওই ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? আমরা চাই ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ইনক্রিমেন্ট আদায়ের নামে, পদোন্নতি আদায়ের জন্য মব সৃষ্টি করার রাজনৈতিক প্রবণতা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা সরকারকে বুঝতে হবে। আহসান এইচ মনসুরের চুক্তি বাতিল করলে, তিনি আপ সে আপ চলে যেতেন। তার জন্য ঝি’কে মেরে বউকে বোঝানোর দরকার ছিল না। আহসান এইচ মনসুরের সেই যাওয়াকে মব দিয়ে সিক্ত করতে হবে এই মানসিকতা তো ভালো কোনো বিষয় নয়। সামনের দিনগুলোতে এই প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কর্মকর্তাদের অন্য সব প্রতিষ্ঠানেই তো মব কালচার হয়ে উঠতে পারে রাজনীতির পতাকা তুলে। বিএনপি এখন ক্ষমতায়, আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাচ্ছেন, একটি ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হোক সারা দেশে। তার এই সংগ্রামে, তার ওয়াদায় মানুষ বিশ্বাস করেছে। তারা চায় এমন কিছু যেন দল থেকে, দলের নামে সিবিএ নেতারা যেন মব সৃষ্টি না করে। করলে তার লক্ষ্য ভুল পথে যাবে। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ যেন মব সংস্কৃতির গা ছুঁয়ে না যায়, আমরা সেটাই দেখতে চাই। এবং বিএনপির নামে যেন চাঁদাবাজি করতে না পারে কোনো নেতা, গুপ্ত নেতারা, ঘাপটি মেরে থাকা নেতারা, নতুন আসা ফ্যাসিস্টের চেলা-চামু-ারা সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত দলের।
দলের সংগঠনিক শক্তির ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক কর্মধারা। সেই কর্মধারায় যেন নিপীড়িত মানুষেরা সরকারের সেবা পায় বেশি, সেটা নিশ্চিত করাও দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব। এটা যদি প্রাবাদিক হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সামনের দিনগুলোকে খারাপ দিন হিসেবেই গণ্য করা হবে। আর ওই ইমেজ নিয়ে সরকার প্রধান সামনে দিকে এগুবেন কেমন করে? দলীয় লোকেদের তদবির, দলবাজি বা বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে নিজের পায়ে কুড়াল মারার সমান। আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নামে অপসংস্কৃতির ধারকরা দলের পতাকার নিচে যেন জায়গা না পায়, সেই তদবির আমরা করি। তারেক রাহমান চাচ্ছেন দেশের গরিব মানুষের কর্মসংস্থান, উৎপাদক কৃষকের ফসল উৎপাদনে শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রাখার প্রয়াস, খাল কেটে পানি ধরে রাখার সেই কীর্তিই নতুন প্রণোদনায় নিয়ে আসতে, সেখানে তার কর্মীবাহিনী যেন এ-রকম কাজে লিপ্ত না হয়, সেটা বুঝতে হবে। আর তিনি ২০ কোটি গাছের চারা রোপণের কথা বলেছেন। সেটা দেশের ছোট-বড় নদীর দুই পাড়ে লাগালে এবং নদী খনন করে প্রবাহ ঠিক পথে নিয়ে গেলে, কুড়ি কোটি গাছে তেমন জায়গা লাগবে না। টিভিতে একজনকে বলতে শুনলাম, ৫০ কোটি গাছ লাগালে বাংলাদেশ জঙ্গলে পরিণত হবে। গাছের নাম অক্সিজেন ফ্যাক্টরি সেটা তিনি ভুলে গেছেন। ২০ বা ৫০ কোটি গাছের চারা রোপণ করলে, সব নদ-নদীর দুই পাড়ও পূর্ণ হবে না। জঙ্গল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রাজনীতি থেকে আবেগকে কেচে নামিয়ে আনতে হবে। তা না হলে যুক্তি মুক্তি পাবে না। সে যুক্তি ইউরোপিয়ান হোক বা এশিয়ান, তাতে কোনো দোষ নেই। আমাদের উন্নয়নের প্রগতিকে প্রাযুক্তিক ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করতে চাই। আর শিক্ষাকে প্রায়োগিক জীবনের অধীন করাই যুক্তিযুক্ত। যারা চাষাবাদে জড়িত, তাদের শিক্ষা কৃষি সেক্টরে হলে লোকবলের ঘাটতি হবে না। কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তিকে জুড়ে দেওয়া যেতে পারে। সবাইকে বিএ/এমএ পাস করার দরকার নেই। ইতিহাস/বাংলা বা কেমেস্ট্রির শিক্ষার্থীর জন্য ব্যাংকিং জব উপযুক্ত নয়। কেবলমাত্র যারা উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত রেজাল্ট করবে, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাবে। আমি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে দেওয়ার পক্ষে। প্রতিটি পরিবারকে শিক্ষা দিয়ে তাদের কর্মজীবনের উপযুক্ত করাই শ্রেয়তর কাজ। সেটা করব, নাকি সরকারি অফিসের কেরানি/কর্মচারীদের সিবিএ নেতা বানাব?
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
