দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্প্রতি সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি (রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট-আরটিএ) বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর গতকাল বুধবার ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সরকারীপর্যায়ে বৈঠকে চুক্তিটি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাসহ দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে উভয়পক্ষ নিজ নিজ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের পল কাপুর বলেন, বৈঠক ভালো হয়েছে। তবে তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান পরে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পল কাপুরকে সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং জাতীয় স্বার্থ ও অভিন্ন অগ্রগতি লাভ করতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে ঢাকার কৌশল তুলে ধরেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে বাংলাদেশের দুই নাগরিক নিহত হওয়া ও সাতজন আহত হওয়ার তথ্য পল কাপুরকে দিয়ে কূটনৈতিক উপায়ে সংঘাতের সমাধানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে সম্প্রতি যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছু নেই।
চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে দুই পক্ষেরই কিছু দাবি থাকে। কিছু ধারা এক পক্ষের অনুকূলে থাকে, আবার কিছু ধারা অন্য পক্ষের জন্য সুবিধাজনক হয়। আলোচনার মাধ্যমে একটি “উইন-উইন” (সব পক্ষের জন্য সুবিধাজনক) পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।’
তিনি বলেন, এই চুক্তিকে এখনই পুরোপুরি নেতিবাচক বা ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে এর অনেক ধারা কাজে লাগানো যাবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালতের ট্যারিফ-সংক্রান্ত রায়ের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিষয়টি এখনো বিকাশমান।
চুক্তি সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো চুক্তিই চূড়ান্ত নয়। প্রতিটি চুক্তিতে সংশোধন ও পুনরায় আলোচনার সুযোগ থাকে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আলোচনা করে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে আগে চিঠি দিয়ে অন্যপক্ষকে জানাতে হবে। বাংলাদেশ এখনো এমন চিঠি দেয়নি। এ ছাড়া, ৬০ দিন আগে জানিয়ে যেকোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
ভিসা বন্ড প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে। সরকার চায় দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যেন সহজে যাতায়াত করতে পারেন এবং কোনো বাধার মুখে না পড়েন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কিছু নন-ট্যারিফ বাধা দূর করা গেলে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ আরও বাড়বে। এসব বাধা দূর হলে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থায়ন কার্যক্রমেও বাংলাদেশ আরও সহজে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক : পল কাপুর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গেও বৈঠক করেন। এ বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
পল কাপুর বলেন, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিএসওএমআইএ) ও অ্যাকুইজিশন ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (এসিএসএ) সই প্রসঙ্গ আসেনি।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছে।
পল কাপুর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন।
ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সবগুলো বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
তিনদিনের সফরে পল কাপুর মঙ্গলবার ঢাকা আসেন। আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে।
