পরপর কয়েকটি ঘটনা যেন আরও এক ধাপ ঘৃণা ছড়াচ্ছে শোবিজে। শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন খবর, আত্মহত্যা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এমনকি মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে টেলিপাড়ার দুটি বড় ঘটনার দরুন সাধারণ জনজীবনেও চলছে তুমুল আলোচনা
বিনোদন দুনিয়ার মানুষদের প্রতি সাধারণ মানুষের বরাবরই বাড়তি আগ্রহ থাকে। পর্দায় বা স্টেজে পারফর্ম উপভোগ করার পাশাপাশি তাদের চালচলন, চলাফেরা, পোশাক-আশাক, এমননি বৈচিত্র্যময় ফ্যাশনও অনুসরণ করেন মানুষ। একটা সময় গ্ল্যামার অঙ্গনের তারকাদের প্রতি দর্শকের মনে এক ধরনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কাজ করত। প্রিয় তারকাদের নিয়ে গর্বও করতেন অনেক। কিন্ত সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে শুরু করে বিনোদন জগতের পরিবেশ। বর্তমানে এই পরিবেশ হয়ে গেছে অসুস্থ, অস্বস্তি ও অস্বাস্থ্যকরে। প্রিয় তারকাও পরিণত হচ্ছেন ঘৃণার পাত্রে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে পরপর কয়েকটি ঘটনা আরও যেন এক ধাপ ঘৃণা ছড়াচ্ছে দেশীয় শোবিজে। শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন খবর প্রকাশ, আত্মহত্যা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল বক্তব্য, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এমনকি মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও ঘটেছে মাত্র তিন-চার দিনে। বিশেষ করে টেলিপাড়ার দুটি বড় ঘটনার দরুন শোবিজের পাশাপাশি সাধারণ
জনজীবনেও চলছে তুমুল আলোচনা। কোনো রকম সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করে সোশ্যাল মিডিয়াতেও যেন এক ধরনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। তারকা কিংবা দর্শক যে যার মতো নিজেদের ইচ্ছের বাহাদুর হয়ে মন্তব্য করছেন ফেসবুক লাইভে এসে। শোবিজের সংগঠনগুলোও অনেকটা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করায় এক ধরনের অবিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। শিল্পীরাও অভিযোগ করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন সামাজিক ও গণমাধ্যমকে। ফলে দ্রুত তিল থেকে তালে পরিণত হচ্ছে সবকিছু।
বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি টিভি অভিনেতা জাহের আলভীর স্ত্রী আফরা ইবনাত ইকরার আত্মহত্যার ঘটনার পর থেকেই ঘোলাটে হয় টেলিপাড়ার পরিবেশ। আত্মহত্যার আগে থেকেই শুটিংয়ের কাজে নেপালে অবস্থান করছেন জাহের আলভী। স্ত্রীর এমন খবর শুনে দেশে না আসা, ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং লাইভে এসে তার বক্তব্য শুনে দর্শকের কাছে তুমুল ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন অভিনেতা। সবার মুখে ফুটতে থাকে কথার খই। আত্মহত্যার মূল কারণ এখন পর্যন্ত জানা না গেলেও, তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠজন ও বান্ধবীরা জানান, জাহের আলভীর সঙ্গে ইফফাত আরা তিথি নামের এক উঠতি টিভি অভিনেত্রীর পরকীয়ার বলি হতে হলো ইকরাকে। ঘনিষ্ঠজনদের তিথির সঙ্গে আলভীর কথিত ‘বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক’-এর জেরে ইকরার সংসারে অশান্তি শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন। ইকরার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবিতে ‘জাস্টিস ফর ইকরা’ নামের একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম মানববন্ধন করেছে। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা আলভী ও তিথিকে বয়কটেরও ডাক দিয়েছে। বর্তমানে তিথির সঙ্গেই নেপালে শুটিং করছেন আলভী।
এ ঘটনার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিথি। প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে মুখ খুলতে ছাড়েননি তিথিও। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন ব্যক্তিগত চ্যাটের স্ক্রিনশট। সেখানে লেখা ‘ভেবেছিলাম এগুলো পাবলিকলি দেব না। প্রশাসনের প্রয়োজন হলে সেখানে দেব, সবার সম্মান রক্ষার্থে। কিন্তু আমাকে যেভাবে হ্যারাস করা হচ্ছে, আর চুপ থাকা গেল না। অলরেডি কিছু জায়গায় অডিও স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম আমি। আর যারা নিজেরা খুব সাধু সাজছেন, আপনারা কী, সেটার আমলনামাও আছে।’ দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিথি দাবি করেন, আলভীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো ‘ভুল ব্যাখ্যা’ ও ‘অপপ্রচার’। ইকরার সঙ্গে তার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল বলে আগেই পরিষ্কার করেছেন। পোস্টে ‘ইকরার সঙ্গে ছিল স্বাভাবিক যোগাযোগ’ দাবি করে তিথি জানান, ইকরার সঙ্গে তার নিয়মিত ও স্বাভাবিক কথাবার্তা হতো। পারিবারিক অশান্তি, ব্যক্তিগত হতাশা ও ডিপ্রেশনের বিষয়েও ইকরা বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে কথা বলেছেন। স্ক্রিনশটগুলো প্রকাশ করে তিথি বলেন, ‘ইকরার সংসার ভাঙার কোনো ইচ্ছা কখনোই ছিল না।’ বরং তিনি ইকরাকে কাজের মধ্যে সক্রিয় থাকতে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে উৎসাহ দিয়েছেন। ‘আমি কখনো বলিনি তুমি ডিভোর্স দাও, আমি আলভীকে বিয়ে করব। বরং বলেছি, তুমি তার কুইন।’ ইকরাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগও সরাসরি অস্বীকার করেন তিথি। সেই সঙ্গে জুড়ে দেন অনেক গল্প।
তবে আলোচিত এ ঘটনা হঠাৎ করেই অনেকটা চাপা পড়ে যায় ছোট পর্দার সময়ের আলোচিত অভিনেত্রী তানজিন তিশা ও উঠতি অভিনেত্রী সামিয়া অথৈয়ের ‘মারধর’ কাণ্ডে। গত মঙ্গলবার বিকেলে কেঁদেকেটে ফেসবুক লাইভে এসে তানজিন তিশার প্রতি গুরুতর ‘মারধর’-এর অভিযোগ তোলেন জুনিয়র শিল্পী সামিয়া অথৈ। তার দাবি মানিকগঞ্জে ঈদের একটি নাটকের শুটিংয়ের সেটে থাপ্পড়ের দৃশ্যে তিশা তাকে বাস্তবেই জোরে চড় মেরে গাল ফুলিয়ে দিয়েছেন এবং খামচি দিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এটি কোনো অভিনয় ছিল না, বরং আগে থেকেই তিশা তাকে দেখতে পারেন না। শুরুতে ফেসবুক লাইভে এসে এমন দাবি করেন অথৈই। পরে তিনি বিচার চেয়ে অভিনয় শিল্পী সংঘের দ্বারস্থ হন। অন্যদিকে তানজিন তিশার দাবি, তিনি অটিস্টিক একটি চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, যেখানে চরিত্রের প্রয়োজনে আগ্রাসী দৃশ্যটি করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, পেশাগত কাজকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। নাটকের পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু এবং অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম এটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে অভিহিত করেছেন। সেলিম জানান, বিষয়টি পারস্পরিক আলোচনায় সমাধান করা যেত।
ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া দিতে শুরুতে বিলম্ব করলেও পেরে তিশা জানান, ‘আমি এতক্ষণ একই নাটকের শুটিং করছিলাম। আমি চাইনি দৃশ্যটা শেষ না করে কাজটা ফাঁসিয়ে দিতে। অথচ যে (সামিয়া) লাইভটা করেছে, সে কিন্তু ইউনিটকে ফাঁসিয়ে দিয়ে গেছে।’ সামিয়াকে ‘মারধর’-এর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিশা বলেন, ‘আমি শুধু আমার চরিত্রটা প্লে করেছি। এখানে আমি একজন স্পেশাল চাইল্ড। মানে অটিস্টিক। যে কি না চরিত্রের প্রয়োজনে মারতে পারে, কামড় দিতে পারে, পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলতে পারে এ রকম অনেক ঘটনা ঘটাতে পারে। কাজটা রিলিজ হলেই দেখতে পারবেন।’ তিশার অভিযোগ, ‘সে (সামিয়া) এমনভাবে লাইভ করেছে যেন আমি তাকে পারসোনালি অ্যাটাক করেছি। এখানে পারসোনালি অ্যাটাকের কিছুই নেই, তার বুঝতে ভুল হয়েছে। আমি যতটুকু করেছি, আমার চরিত্রের প্রয়োজনে করেছি। যতটুকু স্ক্রিপ্টে আছে, ততটুকুই করেছি। আমি চরিত্রের বাইরে কিছুই করিনি। এটা তার দুর্বলতা যে প্রফেশনাল সমস্যাটাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নিয়েছে।
তানজিন তিশা আরও বলেন, ‘ওই অভিনেত্রী আমার বিরুদ্ধে মানহানিকর মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। আমার গা থেকে গন্ধ আসে, ‘আমি নাকি গাঁজা খেয়ে শুটিং স্পটে ঢুকি। তিনি নাকি ড্রাইভারের কাছে এমন কথা শুনেছেন। এটা হাস্যকর। কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করে শুধু একজন ড্রাইভারের মুখের কথা শুনেই গণমাধ্যমে আমার নামে এমন বদনাম ছড়ালেন! এ ছাড়া অথৈ বলেছেন, আমি এক ঘণ্টা ওয়াশরুমে ছিলাম। এ কথার মাধ্যমে তিনি কীসের আভাস দিয়েছেন তা সবাই হয়তো বুঝতে পেরেছেন। সবমিলিয়ে আমি মানহানির মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এমন পাল্টাপাল্টি বয়ানের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ শিল্পীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে লাইভে এসে অভিযোগ ভালোভাবে নেয়নি ছোটপর্দার অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন ‘অভিনয়শিল্পী সংঘ’। এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি আজাদ আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে সব শিল্পীদের সতর্ক করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশের সব সদস্যদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, একজন পেশাজীবী হিসেবে স্ব-সংগঠনের অথবা অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম সংগঠনসমূহের কোনো সদস্যের সঙ্গে কোনো প্রকার জটিলতা বা মতভেদ সৃষ্টি হলে তা সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে অবহিত না করে, উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে প্রচার করা অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশের আচরণবিধির পরিপন্থী।’
সাংগঠনিক কাঠামো ও আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো জটিলতা সমাধান করা সম্ভব এমনটা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘এহেন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক আলোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যদিয়েই সমাধান হওয়া উচিত বলে আমরা বিশ্বাস করি। কেননা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা একতরফাভাবে উপস্থাপিত হলে তা একদিকে যেমন সামাজিকভাবে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সমাজের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, অন্যদিকে অনাকাক্সিক্ষত বিভ্রান্তি ও নেতিবাচকতা ছড়িয়ে দিতে পারে।’
