জলাবদ্ধতায় কমেছে ৩০ হাজার টন ফসল উৎপাদন

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১:১০ এএম

চাঁদপুরের মতলবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খাল সংস্কার না হওয়ায় জলাবদ্ধতায় ফসল উৎপাদন কমেছে ৩০ হাজার টন। ফলে অধিক মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এর অভ্যন্তরে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫২ কিলোমিটার খাল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে খনন হয়নি। এতে এ অঞ্চল জুড়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।

স্থানীয় কৃষক শাহাদাত হোসেনের দাবি, মতলব উত্তর উপজেলার জলাবদ্ধতা প্রধানত তিন ধরনেরস্থায়ী, অস্থায়ী এবং মাঝারি। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি। সেখানে সারা বছর পানি জমে থাকে। মাঝারি জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১২ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়ছে।

মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে ১৫২ কিলোমিটার খালের মধ্যে শুধু ১২ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ১৪০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়নি সেচ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছরেও। খালগুলোর অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখলের কারণে এসব এলাকার পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয় না, ফলে ফসল রোপণের মৌসুম গড়িয়ে যায় এবং প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদী ও খালের দখল বন্ধ করে অধিক ফসল ঘরে তোলা। কিন্তু খাল দখল ও খনন না হওয়ায় সেচ কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে এবং আবাদি জমি ধ্বংসের পথে। এ ছাড়া প্রকল্পের অভ্যন্তরে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণের কারণে প্রতিবছর ফসলি জমির পরিমাণ কমছে।

জানা গেছে, মতলব উত্তরের ৬৪ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ ১৭ হাজার ৫৮৪ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা ও ১৩ হাজার ৬০২ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নির্মিত হলেও এখনো সেই লক্ষ্যপূরণ সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের দুটি পাম্প হাউজের ২৫৫ কিউসেক করে পানিপ্রবাহের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বোরো মৌসুমে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৫ হাজার ৬১৯ হেক্টর গ্র্যাভিটি সিস্টেমের মাধ্যমে সেচ পায়। ৮৮৬ হেক্টর জমিতে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করেন। তাছাড়া ৪৯৩ হেক্টর জমিতে লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়।

মেঘনা-ধনাগোদা পওর বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী তন্ময় পাল বলেন, ‘ইতিমধ্যে ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ১১৮ কিলোমিটার খাল খননের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কাগজে-কলমে উল্লেখিত সক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। খাল দখল ও অবৈধ ভরাটের কারণে বর্ষা মৌসুমে পানি অপসারণ করা যায় না এবং বোরো মৌসুমে কৃষকের জমিতে সময়মতো পানি পৌঁছাতে সমস্যা হয়।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে খালগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালী মহল অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালুব্যবসা পরিচালনা করছে। এর ফলে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের কমিটিগুলো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গঠিত হওয়ায় প্রকৃত কৃষকরা সঠিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।

কৃষকদের অভিযোগ, ৩০টি পানি ব্যবস্থাপনা দল, ছয়টি অ্যাসোসিয়েশন ও একটি ফেডারেশন পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উপেক্ষিত। দায়িত্ব পালন করছে কৃষক নামধারী কিছু ঠিকাদার, যারা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কৃষকের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত।

মতলব উত্তর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা পরিষদ প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আতাউর রহমান সরকার বলেন, ‘খাল পুনঃখনন ও সেচনালা সম্পন্ন করা গেলে বছরে চার মৌসুম ফসল উৎপাদন সম্ভব; অন্যথায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে বনায়নের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘১২ হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকলে প্রায় ৩০ হাজার টন ফসল উৎপাদন কম হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফসলের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে এবং কৃষকরা আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়বেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের খাল খনন একটি মেগা প্রজেক্ট। আশা করছি, অতি দ্রুতই মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের খালগুলো খনন হবে। আমরা ইতিমধ্যে দুটি খাল খননের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত