যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে যুদ্ধের দামামা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার পথে হাঁটছে। আজ রবিবার এই যুদ্ধের অষ্টম দিন; গত এক সপ্তাহের সংঘাতে ইরানে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৩২০ জন; যার মধ্যে ১ হাজার ৯৭ জনই বেসামরিক নাগরিক। বিপরীতে ইসরায়েলে ১১ জন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ১১ জন ও কুয়েতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ সেনাসদস্য নিহত হয়েছে। যদিও ইসরায়েল কখনোই যুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য প্রকাশ করে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে এই যুদ্ধের চেহারা বদলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঘটনায় পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও বিমান কোথায় অবস্থান করছে সেই তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে মস্কো। এর ভিত্তিতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্রের তিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয় এই সহযোগিতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই সংঘাতের সঙ্গে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পারমাণবিক শক্তিধর ও উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতাসম্পন্ন ‘রাশিয়া’ এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে হলেও জড়িয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তিন কর্মকর্তা জানান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, মনে হচ্ছে বেশ ব্যাপকভাবেই ইরানকে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও ওয়াশিংটনে অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাস থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি। মস্কো ইতিমধ্যে এই সংঘাতকে ‘বিনা উসকানিতে আগ্রাসন’ উল্লেখ করে তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার সহায়তার ব্যাপ্তি ঠিক কতটা, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করার নিজস্ব সক্ষমতা হারায় ইরান। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত রবিবার কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলায় ৬ জন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক অবস্থান, দূতাবাস ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। অন্যদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, যুদ্ধজাহাজ এবং দেশটির নেতৃত্বসহ ইরানের দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ দারা মাসিসট বলেন, ইরান খুবই নিখুঁতভাবে আর্লি-ওয়ার্নিং রাডারে আঘাত হানছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার উন্নত মহাকাশ সক্ষমতা তাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন- ইরানকে উচ্চমাত্রায় পাল্টা হামলা করতে দেখা যাচ্ছে, যা কেবল ‘আধুনিক’ সক্ষমতা থাকলেই সম্ভব। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের হামলার মান এবার উন্নত হয়েছে। ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, ইরান সরকার পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রতিদিন কমছে, নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এবং (অস্ত্র) উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও সেভাবে লড়াই করতে পারছে না। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ইরানের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক রাশিয়া ও চীনকে কোনো বার্তা দিতে চান কি না চলতি সপ্তাহে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, তার দেওয়ার মতো কোনো বার্তা নেই এবং তারা আসলে এখানে কোনো বড় প্রভাবক নয়। যদিও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে হেগসেথের সে অনুমান ভুল হলেও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল অবকাঠামো, রাডার এবং কুয়েতের অস্থায়ী সেনাছাউনির মতো জায়গায় ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ধরন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি গত কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনটিও হামলার শিকার হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, পেন্টাগনের হাতে থাকা নিখুঁত অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই অভিযান অনুমোদনের বিষয়ে ভাবছিলেন, তখন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসন কেইনের সেই মূল্যায়নকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে না।
ভীতি ছড়াচ্ছে ‘শাহেদ ড্রোন’
ইরানের শাহেদ সিরিজের ‘কামিকাজে’ ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে এক ভয়ংকর আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। এর রয়েছে জ্বালানিসাশ্রয়ী ইঞ্জিন, রাডার এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এবং ৪০ থেকে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতা। মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচে তৈরি হওয়ায় শাহেদ ড্রোন, বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে এসব ড্রোন দিয়ে যে কোনো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সহজেই দিশেহারা করে দেওয়া যায়। শাহেদ-১৩১ ও ১৩৬ সিরিজের এসব ড্রোন মূলত সাধারণ মানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরান এগুলোকেই প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ড্রোনগুলো সামরিক ঘাঁটি, তেল শোধনাগার ও বেসামরিক স্থাপনায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে।
হাইপারসনিক গতি বা অত্যাধুনিক স্টিলথ প্রযুক্তির নয়, বরং এ ড্রোনের মূল শক্তি হলো এর বিপুল সংখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়টের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে ইরান শত শত ড্রোনের ‘ঢেউ’ পাঠায়। এই যুদ্ধে ইরানের কৌশল হলো এই ‘উড়ন্ত ক্ষেপণাস্ত্র’ দিয়ে প্রথমে প্রতিপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়া। এরপর বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো, যেন এগুলো অনায়াসেই লক্ষ্যভেদে সফল হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে। তবে এসব ড্রোনের বেশির ভাগ ভূপাতিত করা হলেও, ইরানের জন্য তা একধরনের জয়। কারণ, মাত্র ২০ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ৪০ লাখ ডলার মূল্যের শক্তিশালী রকেট খরচ করতে হচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব একটি বড় সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না।
