জ্বালানি তেলের সীমিত সরবরাহ ও রেশনিং ব্যবস্থার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রাম নগরীর রাইড শেয়ারিং চালকরা। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেও মাত্র অল্প পরিমাণ জ্বালানি পাওয়ায় তারা আগের মতো রাস্তায় নামতে পারছেন না। ফলে দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
গতকাল রবিবার নগরের দামপাড়া, নয়াবাজার, চকবাজার ও দুই নম্বর গেট এলাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন। তীব্র রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাত্র ২০০ টাকার বা দুই লিটার জ্বালানি মিলছে। এই অল্প পরিমাণ দিয়ে সারা দিন রাইড শেয়ারিং সেবা দেওয়া অসম্ভব হওয়ায় অনেককে আবার অন্য পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
নগরের গনি বেকারির কিউসি পাম্পে তেল নিতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঠাও রাইডশেয়ার চালক মোবাশ্বের। উত্তরবঙ্গ থেকে এসে পরিবার নিয়ে শুলকবহর এলাকায় থাকেন তিনি। চাকরি হারানোর পর প্রায় দুই বছর ধরে চট্টগ্রামে রাইড শেয়ারিং করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া অল্প জ্বালানি দিয়ে আগের মতো আয় করা যাবে না বলে জানান তিনি।
মোবাশ্বের বলেন, ‘রোজা রেখে এতক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তেল পাওয়ার আগেই শরীর ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। এত কম তেলে সারা দিন রাইড দেওয়া সম্ভব না। লাইনে দাঁড়ানোর ফলে সময় ও শ্রম দুটোই নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আয় আর হবে বলে মনে হচ্ছে না। এভাবে চললে ঈদের মৌসুমে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
রাইড শেয়ারিং চালকরা জানান, বাইকের ধরন অনুযায়ী তাদের গড়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক পাম্পে একবারে দুই লিটারের বেশি দিচ্ছে না। ফলে দিনের মধ্যে কয়েকবার শহরের বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ দুই লিটার জ্বালানি বিক্রির নির্দেশনা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাইড শেয়ারিং চালকরা বলছেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কাজের সময়ের বড় অংশ পেট্রোল পাম্পের লাইনে কাটছে। ফলে আগের মতো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং দৈনিক আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক রাইড শেয়ারিং চালক পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক দিন কাজ কম হলেই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
নগরের আরেক রাইডার রকিব বলেন, ‘আগে এক বা দুইবার তেল নিলেই সারা দিন চলত। কিন্তু এখন দিনে কয়েকবার তেল নিতে হয় এবং প্রতিবারই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হয়। তেল নেওয়ার জন্য যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে বাকি সময় দিয়ে কতটুকু রাইড দেওয়া যাবে? এতে আয় কমে যাচ্ছে।’
এদিকে, নগরের কয়েকটি পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে দামপাড়া এলাকার ফুয়েল স্টেশন, নয়াবাজার হাক্কানী ফুয়েল পাম্পসহ কয়েকটি পাম্পে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় চালকদের ফিরে যেতে দেখা গেছে।
পাম্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং অনেক চালক আগাম জ্বালানি মজুদ করার চেষ্টা করায় পাম্পগুলোতে চাপ বেড়েছে। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেল আসে না। ফলে বৃহস্পতিবার ডিপো থেকে নেওয়া তেল স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয়ে যাওয়ায় কিছু স্টেশন তেলশূন্য হয়ে পড়ে।
রাইড শেয়ারিং চালকরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে তাদের জীবিকা মারাত্মক সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে নগরবাসীর যাতায়াতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
