কাবার মাঠের ইফতার

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৬ এএম

১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ। রমজান মাস। কাবা মাঠের উত্তর দিকে পাহাড়ের ঢালে দ্বার আবু তুর্ক হোটেলে আমরা দুজন। হোটেল থেকে বের হয়ে রাস্তা পাড় হলেই, কাবার মাঠ। রমজানে দিনের বেলা সেটা যেন ঘুমিয়ে থাকে। আগের দিন দেশি ইফতার খুঁজতে গিয়ে বেহাল দশায় পড়েছিলাম। ঠিক করেছি, আজ মনের মতো ইফতার খুঁজে বের করার জন্য আগেই বের হবো। ইফতারি নিয়ে হোটেলে ফিরে দেখি সঙ্গী সালমা নেই। গতকাল সারা দিন রোজা রাখার পর মনের মতো ইফতার না পেয়ে, আজ সময় করে ইফতারের খোঁজে বের হয়েছিলাম। ফিরে আসার পর ইফতারের তখনো পাঁচ-সাত মিনিট বাকি ছিল। এ সময় সালমার বাইরে থাকার কথা নয়! হোটেলের ছোট ছোট রুম। জিলহজ মাসে মৌসুমি ও অন্যান্য মাসে আমাদের মতো অমৌসুমি হাজি ছাড়া এসব হোটেলে কেউ থাকে বলে মনে হয় না। সত্যি কথা বলতে কি, এই এলাকা থেকে পবিত্র হারাম শরিফ কেন্দ্রিক কর্মকা- বাদ দিলে, অত্র এলাকা যে বিরান ভূমি ছিল সে বিরান ভূমিই থাকত। হোটেলগুলো অনেকটা পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মৌসুমি হোটেলের মতো। পর্যটন মৌসুমে যেমন হোটেল-মোটেলে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। পর্যটন মৌসুম ছাড়া, হোটেল মালিকরা হোটেলের সিকিউরিটি সুইপারদের বেতন-ভাতা দিতেই হিমশিম খান।

ইফতারের সময় আসন্ন। সালমা নেই। ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজের সময়ও পার হয়ে গেল এর মধ্যে সালমাকে ফিরতে না দেখে খারাপ লাগা বাড়তে শুরু করে। মনে পড়ে, গতকাল ইফতারের আগে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর সালমা মনের মতো ইফতার গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিল, ‘আজ রোজা ধরেছে। রোদের ভেতর কয়েকবার হারাম শরিফে আসা-যাওয়ার ফলে এমনটা হয়েছে। পিপাসায় আমার বুক পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। সাহরির সময় তেল-মশলা মিশ্রিত ভাত এক লোকমাও খেতে পারিনি।’ স্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে কোনো স্বামী ঠিক থাকতে পারে? বেঠিক হয়ে আমিও সঙ্গে সঙ্গে বললাম- ‘এক্ষুনি যাচ্ছি। দেখি, নাজিমুদ্দিন রোডের ইফতার পাওয়া যায় কিনা।’ হোটেল থেকে বের হয়ে পড়ি। আমিও মনের মতো ইফতার সামগ্রী কেনার জন্য মক্কার মাঠে নেমে পড়েছি। ইফতার সামগ্রী নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করেই দেখি, সালমা নেই। মিনিট ত্রিশেক পর হাতে পলিথিনের ব্যাগসহ সহাস্যে হোটেলে প্রবেশ করে আমার সামনে রাখতে রাখতে

- দেখেন কত রকমের ইফতার নিয়ে এসেছি!

- (আমি ‘থ’ হয়ে) এত ইফতার! কে দিয়েছে?

- কাবার মাঠের ইফতার।

- কাবার মাঠের ইফতার, মানে?

- কাবার মাঠের ইফতার মানে কাবার মাঠের ইফতারই। কয়েক প্রকারের খেজুর, ফলের জুস, নানা রকমের তাজা ফল, কেক, বিস্কুট, বাটার বন, ক্রিম রোল, মাখন, পনির, টকদইসহ নাম না জানা আরও কয়েক প্রকারের লোভনীয় ইফতার সামগ্রীতে হোটেলের ফ্লোরটা ভরে উঠল।

- (বিস্মিত হয়ে) আরে বলো না, এত সুন্দর ইফতার কোথায় পেয়েছ?

- কাবার মাঠ থেকে এ ইফতার সংগ্রহ করেছি। তা শুনে লজ্জিত হয়ে এসব বলছ কি তুমি! বাংলাদেশের একজন সিনিয়র উকিলের গিন্নি হয়ে ইফতার কালেকশন করতে গিয়েছ কাবার মাঠে! লোকে শুনলে মান-ইজ্জত সব পাংচার হয়ে যাবে।

 আপনার মান-ইজ্জত নিয়ে আপনি ঘরে বসে থাকেন। আমি এখানে যতদিন থাকব, ততদিন কাবার মাঠে গিয়ে ইফতার করব। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে প্রাইভেট গাড়িতে করে, কাবার মাঠে ইফতার করতে আসে। আর আমরা মাঠের পাশে থেকে ইফতার করতে গেলেই, আপনার মান-সম্মানের চাকা পাংচার হতে শুরু করে। গিন্নিকে তার অবস্থান থেকে টলাতে ব্যর্থ হয়ে বলি আগামীকাল আমিও কাবার মাঠে যাব। ইফতার করার জন্য নয়, দেখার জন্য। দেখি আমার সোজাসাপ্টা গিন্নিটা, কী পেয়ে স্বামীর কথায় পাত্তা দিচ্ছে না। পরদিন আসরের নামাজের আগেই কাবার মাঠে হাজির হই। সুবিধা মতো এক জায়গায় বসে পড়ি। দেখতে দেখতে মাঠ ভরে ওঠে। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ। যেখানে বসেছি, সেখান থেকে কাবা মসজিদের ওপর দিয়ে দক্ষিণের জমজম টাওয়ারের ওপরের অংশ দেখা যায়। আমার সামনে কাবা মসজিদের সম্প্রসারিত ভবনের পূর্বাংশের দেয়ালের বাইরের অংশ। ভবনের পেছনে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কাঁচা-পাকা হোটেল, দোকানপাট ও বাড়িঘর। ওপরের দিকের আবাসিক এলাকায় যানবাহন ওঠা সম্ভব নয়। আমার ধারণা, ওপরের বাড়িঘরে পাহাড়ি ছাড়া সাধারণ মানুষ ওঠানামা করতে পারবে না। 

ইফতারের সময় সমাগত প্রায়। সারি সারি মানুষ মুখোমুখি হয়ে যুগল সারিতে কাবার মাঠ ভরে গেছে। সাহায্য কর্মীরা দু’সারির মাঝখানে পলিথিন পেপার বিছানোর কাজ শুরু করেছে। আমার ডান বাম ও সামনে ছিল কয়েকজন পাকিস্তানি লোক। সাহায্য কর্মীদের কেউ কেউ গাড়িতে করে জমজমের পানিপূর্ণ জার নিয়ে আসে। জারের একদিকে সংযুক্ত রয়েছে ওয়ান টাইম ইউজ অব্যবহৃত গ্লাস অপরদিকে ব্যবহৃত গ্লাস রাখার বিন। কেউ কেউ কাঁধে করে কার্টন এনে দু’লাইনের মাঝখানে রাখতে শুরু করে। বিশ/পঁচিশ জনের মাঝখানে একটা করে কার্টন রাখা হয়। কার্টনের ভেতর গোটা ত্রিশেক প্যাকেট। প্রত্যেকে একটি করে প্যাকেট হাতে পেয়ে খুশি। খুলে দেখি, গিন্নি গতকাল যেসব ইফতার সামগ্রী বাসায় নিয়েছিল তার অধিকাংশই রয়েছে এ প্যাকেটে। বুঝতে পারি, রমজান মাসে কাবার মাঠে ইফতার বিতরণ মসজিদ কমিটির রুটিন ওয়ার্কের একটি কাজ। রুটিন কর্ম ছাড়াও নানা প্রতিষ্ঠান রমজান মাসে, কাবা মসজিদে ইফতার বিতরণ করে। ইফতার বিতরণের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন কাবার মাঠে সমবেত হয়। ইফতারের সময় কাবার মাঠ লোকে গিজগিজ করে। এতক্ষণে মাথায় ঢুকেছে, মুফতে (মাগনা) এত ইফতার পাওয়া গেলে গাঁটের টাকা খরচ করে ইফতার কিনতে যাবে কে? রোজার মাসে রোজা শেষে কাবার মাঠের ইফতার পেলে সব কষ্ট পুষিয়ে যায়। তাই রোজার শেষ কটা দিন আর পাগল পাগল হয়ে বাইরে ইফতারের সন্ধান না করে কাবার মাঠে মনের মতো ইফতার করতে পেরেছি।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত