ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সঙ্গে কিছু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘তথ্য বিকৃতি’ করার অভিযোগও তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার বলেন, সম্প্রচারমাধ্যমকে অবশ্যই ‘জনস্বার্থে পরিচালিত’ হতে হবে, অন্যথায় তাদের লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কার লিখেছেন, ‘যেসব সম্প্রচারমাধ্যম ভুয়া তথ্য প্রচার করছে, তাদের লাইসেন্স নবায়নের সময় আসার আগে নিজেদের অবস্থান সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।’ আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারের এই মন্তব্যকে অনেকেই গণমাধ্যমের প্রতি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্পের এই ফেডারেল কমিউনিকেশনস চেয়ারম্যান আগেও একাধিকবার প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে খবর ও অনুষ্ঠান প্রচারে গণমাধ্যমকে চাপ দিয়েছেন। এর আগে ট্রাম্পের সমালোচনা করায় কৌতুক অভিনেতা জিমি কিমেল ও টেলিভিশন চ্যানেল এবিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন কার। একটি পডকাস্টে কিমেলকে হুমকি দিয়ে কার বলেছিলেন, ‘আমরা তার আচরণের পরিবর্তন সহজ বা কঠিন উপায়ে করতে পারি। ওই মন্তব্যের পর এবিসি সাময়িকভাবে কিমেলের অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা হয়েছিল; যদিও পরে চাপের মুখে পড়ে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ট্রাম্প প্রশাসন।’ ব্রেন্ডান কারের সর্বশেষ বক্তব্য দ্রুতই রাজনীতিবিদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়ে। হাওয়াইয়ের সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেন, এটি স্পষ্ট নির্দেশনা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করলে লাইসেন্স নবায়ন হবে না। ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিভিজ্যুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশনের (ফায়ার) পাবলিক অ্যাডভোকেসির পরিচালক অ্যারন টেরও যুদ্ধ নিয়ে নেতিবাচক খবরকে চেপে রাখতে চাওয়া কারের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। জনস্বার্থবিষয়ক পরিচালক অ্যারন টের বলেন, যে যুদ্ধ সরকার নিজেই চালাচ্ছে, সে যুদ্ধ সম্পর্কে তথ্য সেন্সর করার অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দেয় না। কারের মন্তব্যটি আসে ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর।
সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ‘ফেক নিউজ মিডিয়া’ এমন প্রতিবেদন করেছে যে, সৌদি আরবে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের জ¦ালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ঘাঁটিটি কয়েক দিন আগে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল, কিন্তু বিমানগুলো ‘আঘাতপ্রাপ্ত’ বা ‘ধ্বংস’ হয়নি। পাঁচটির মধ্যে চারটিতে প্রায় কোনো ক্ষতিই হয়নি এবং সেগুলো ইতিমধ্যে আবার কাজে ফিরেছে। সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ট্রাম্প ও তার মিত্ররা রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে সমালোচনামূলক সংবাদকে দমন করার চেষ্টা করেন, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে, ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাইমারি স্কুলে ‘নির্বিচার’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ জন নিহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে। যদিও নানা সময় বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে এ দায় অস্বীকার করেছেন শান্তির দূত হিসেবে নিজেকে জাহির করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী ওই বোমা হামলার ঘটনা আরও উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে হামলায় ১৬৮ শিশুশিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। এতে স্কুলটির বেশ কয়েকজন স্টাফও প্রাণ হারান। যদি প্রমাণিত হয় যুক্তরাষ্ট্রই এই হামলা চালিয়েছে, তাহলে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সবচেয়ে বেশি বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাগুলোর একটি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ হামলার তদন্ত করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কমান্ডের (সেন্টকম) বাইরে অন্য কমান্ডে থাকা কর্মকর্তাদের এই হামলার ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর তিনজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ যে তদন্তের কথা বলেছেন, সেটি মূলত একটি প্রশাসনিক তদন্ত, যাকে ‘১৫-৬ তদন্ত’ বলা হয়। প্রয়োজন হলে এ তদন্তের ফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
