তামিমের সেঞ্চুরিতে খরা কাটাল বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০২:০৩ এএম

সালমান আগার বলে সোজা ছক্কা মেরে তানজিদ তামিম তিন অঙ্কের রানে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে গেল অনেকগুলো আঙুল। বাংলাদেশের হয়ে শেষ কে কবে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেছিলেন, চলল তারই অনুসন্ধান। ২০২৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তাওহীদ হৃদয় ভারতের বিপক্ষে করেছিলেন ১০০ রান, তার প্রায় ১৩ মাস পর বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান ওয়ানডেতে শতরান করলেন। এই সময়ে ১৪টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলে মাত্র ৪টিতে জয় বাংলাদেশের, এর ভেতর ৮ বার আগে ব্যাটিং করেও বাংলাদেশ পুরো ৫০ ওভার খেলতে পারেনি। এক সময়ের সবচেয়ে সফল সংস্করণে ব্যাটিংয়ের যে দুর্দশা চলছিল, তানজিদ তামিমের শতরান সেই খরা কাটানোরই ইঙ্গিত।

গোটা ত্রিশেক ওয়ানডে খেলে ফেললেও তানজিদ হাসান তামিমের একাদশে জায়গাটা ঠিক পাকাপোক্ত হচ্ছিল না। কখনো সৌম্য সরকার, কখনো নাঈম শেখ কিংবা লিটন দাস, ইদানীং সাইফ হাসান; বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি নিয়ে অদল বদল নিয়মিত দৃশ্য। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেই তানজিদ তামিমের সুযোগ পাওয়াটা ছিল অনিশ্চিত, কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আগের সিরিজের শেষ ম্যাচেই গোড়াপত্তনে বড় জুটি ছিল সাইফ ও সৌম্যর। বিসিএল অলস্টার একাদশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে ওয়ানডের ওপেনিংয়ে ফিরলেন তামিম। সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ৬৭। তবুও নিন্দুকেরা বললেন, লক্ষ্যটা ছোট (১১৫), চাপ নেই তাই ভালো ইনিংস খেলেছেন। বড় মঞ্চে ভালো না করার দুর্নামটা লেগে আছে নামের পাশে, সেটা যতটা না ঘটনা তার চেয়ে বেশি রটনা। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তো গোটা বাংলাদেশ দলই ব্যর্থ। তৃতীয় ওয়ানডেতে তামিম তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই বামহাতি ব্যাটসম্যানের প্রথম। যদিও বিপিএলে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা ৩। ওয়ানডেতে এর আগে সর্বোচ্চ ইনিংসটা ছিল ৮৪ রানের আর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৮৯। ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরিতে প্রায় বছর খানেকের খরা ঘোচালেন তামিম, সেই সঙ্গে নিজের জায়গাটাও হয়তো আগামী কিছুদিনের জন্য পাকা করে নিলেন ওয়ানডে দলে।

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভেতর সবচেয়ে অনায়াসে ছক্কা মারেন তামিম। বল উড়াল পথে সীমানা ছাড়া করতে তার এগিয়ে এসে অনেক জোরে ব্যাট চালাতেও হয় না, নিতে হয় না পাওয়ার হিটিং কোচের টোটকাও। সহজাত হ্যান্ড-আই কোঅর্ডিনেশন আর ন্যাচারাল সুইংয়েই তামিম বাংলাদেশের সেরা ছক্কাবাজদের একজন, ছয়ের সংখ্যায় ক্যারিয়ারের বয়সে অনেকের চেয়ে পিছিয়ে থাকাদেরও ছুঁয়ে ফেলছেন। বাংলাদেশের হয়ে এক ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৮টা ছক্কা মেরেছিলেন লিটন, তবে সেদিন লিটন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেছিলেন ১৭৬ রান। তামিমের ১০৭ রানের ইনিংসে ছক্কার সংখ্যা ৭।

প্রথম ছক্কাটা মেরেছেন হারিস রউফের বলে। পাকিস্তানের এই গতি তারকার বলে ফ্লিক করে বিশাল ছক্কা, পরের ছক্কাটা সনাৎ জয়াসুরিয়াকে মনে করিয়ে দিয়ে ডিপ পয়েন্টের ওপর দিয়ে। স্পিনারদেরও তামিম সামলেছেন দারুণভাবে। অভিষিক্ত সাদ মাসুদ, দ্য হান্ড্রেডে ডাক পাওয়া আবরার আহমেদ, আগের দিনের সেরা বোলার মাজ সাদাকাত থেকে সালমান আলি আগা, কাউকে ছাড় দেননি তামিম। ৪৭ বলে হাফসেঞ্চুরি, সাইফ হাসানকে নিয়ে উদ্বোধনী জুটিতে শতরান; তামিমের ব্যাট বাংলাদেশকে দিয়েছে কাক্সিক্ষত স্বস্তি, দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর যেটা খুবই কাক্সিক্ষত ছিল। ৩৭তম ওভারে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে তানজিদ তামিম যখন আউট হলেন, দলের রান তখন ১৯৪। পরের ১২ ওভারে বাংলাদেশের বাকি ব্যাটসম্যানরা যে ব্যাটিংটা করেছেন, তাতে সতীর্থদের ওপর তামিমের মন খারাপ করাটা খুবই যৌক্তিক। শেষ ১২ ওভারে বাংলাদেশ করেছে ৯৬ রান। লিটন দাস করলেন ৫১ বলে ৪১ আর তাওহীদ হৃদয় ৪৪ বলে ৪৮*। ৩০০’র সম্ভাবনা জাগিয়েও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত করতে পারল ৫ উইকেটে ২৯০ রান। কাজে লাগেনি রিশাদ হোসেনকে আগে নামানোর বাজিটাও, হারিস রউফের প্রথম বলেই উড়ে গেছে তার স্টাম্প।

তামিমের ইনিংসটা কতটা ভালো, তার প্রমাণ আছে স্কোরকার্ডেই। তার সতীর্থরা যে উইকেটে রানের জন্য হাঁসফাঁস করেছেন, সেখানেই তামিমের ব্যাটে স্ট্রোকের প্রদর্শনী। বিশেষ করে লিটন এবং তাওহীদ হৃদয় যে চমৎকার সুযোগটা পেয়েছিলেন স্লগ ওভারে চালিয়ে খেলে দলের রানটা বাড়িয়ে নেওয়ার, সেখানে তাদের কুৎসিত এবং স্বার্থপর ব্যাটিং ছিল রীতিমতো দৃষ্টিকটু। অজুহাত অবশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সবসময়ই ঠোঁটের ডগায়, সংবাদ সম্মেলনে হয়তো বলবেন পরের দিকে উইকেট খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিংবা স্পিনাররা বেশি টার্ন পাচ্ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সত্যি কথাটা হচ্ছে, লিটন কিংবা হৃদয় নিশ্চিত জানেন যে তারা দলে টিকে যাবেন একটা মাঝারি ইনিংস খেলেই, তাই ঝুঁকি নেননি।

প্রায় দেড় বছর পর জাতীয় দলে ফিরে দুটো ইনিংস খেললেন আফিফ হোসেন। একটিতে ১৪, অন্যটিতে ৫। মিডল অর্ডারে ভরসার বামহাত খুঁজতেই তাকে দলে নেওয়া, জানিয়েছিলেন প্রধান নির্বাচক। আবার প্রমাণ হয়ে গেল, তার আসলে অজুহাতটাই শক্তিশালী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত