ঈদযাত্রা অনেকটা স্বস্তির ছিল, এটা আমরা বলেছি। কিন্তু ভাড়া আদায়ে ছিল খারাপ পরিস্থিতি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবার ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাস প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করেছে। আর ঢাকা-কেন্দ্রিক সিটি সার্ভিসের বাসে ৭ দিনে ৬০ লাখ ট্রিপে যাত্রী যাতায়াত করেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, এবার ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। ঢাকা থেকে পাবনার ভাড়া সাধারণত ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা হলেও, ঈদে ছিল ১২০০ টাকা। নাটোরের ভাড়া ৫৫০-৫৮০ থেকে ১২০০ টাকা, রংপুর ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা, নোয়াখালী ৫০০ থেকে ৮০০, লক্ষ্মীপুর ৫০০ থেকে ৭০০, রায়গঞ্জ ৩৫০ থেকে ৮০০, ময়মনসিংহ লোকাল বাস ২৫০ থেকে ৬০০, খুলনা ৫০০ থেকে ৮০০, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর ৪০০ থেকে ৮০০, ভোলা ৪৫০ থেকে ৯০০ এবং ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে পিকআপে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই পর্যবেক্ষণ মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত বলে মনে করা যেতে পারে। তাদের এই সংগ্রহ সঠিক। আমরা স্বস্তির কথা বললেও, সড়কমন্ত্রীর বালখিল্য মন্তব্যকে সমালোচিত হতে দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো বাস কোম্পানি নাকি প্রচলিত ভাড়ার চেয়েও কম নিচ্ছেন। এই রকম আজগুবি তথ্য মন্ত্রীর মুখ থেকে এলে তা ভুক্তভোগীর মুখে অন্যরকম হাসি ফোটে। মন্ত্রী হয় প্রকৃত চিত্র জানেন না, নয় মিথ্যা বলছেন। অথবা এও হতে পারে, মন্ত্রীর সামনে বাস কাউন্টারের লোকজন সত্য গোপন করে মিথ্যা স্টেটমেন্ট দিয়েছে। কিন্তু এবার তা হয়েছে রেকর্ড ভাঙার নমুনা।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। সত্যকেও ঢাকা যায় না, মিথ্যা দিয়ে। বিগত এরশাদ ও হাসিনা সরকার তা প্রমাণ করে গেছে। এই ধরনের প্রকাশ্য মিথ্যাচার তারেক রহমানের সরকারের ইমেজকে কেবল ঘোলা করে দেবে না, তার উন্নয়ন ধারাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। গত ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার গাজীপুর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে থেকে ট্রেনের একটি ছবি দেশ রূপান্তর ছেপেছে। এই ছবি দেখে মনে হয় ভেতরে যেন যাত্রী নেই, সব যাত্রী ট্রেনের ছাদে উঠে বসেছে। মনে হয়, ট্রেনের বগি বা গাড়ির সংখ্যা অত্যন্ত কম। যার দরুন ঘরমুখো যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। একই দশা লঞ্চেরও। লঞ্চে উঠতে গিয়ে যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছেন নৌকা নিতে। আর নৌকায় উঠতে গিয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হন এক যাত্রী। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের ওঠানামার কোনো সুব্যবস্থা কেন নেই সেই প্রশ্ন আমাদের। গ্যাংওয়ে বা লঞ্চে ওঠানামার ‘পাটাতন’ কেন সুপ্রশস্ত হয় না, সেটাও আমাদের প্রশ্ন। লঞ্চঘাটকে এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে লঞ্চে উঠতে না যায়।
ঈদযাত্রায় স্বস্তির কথা আমরা বলেছি এটা লক্ষ্য করে যে, এবার দীর্ঘদিন ছুটি ছিল। সাধারণ মানুষ একসঙ্গে বাস টার্মিনাল, ট্রেন স্টেশনে বা লঞ্চঘাটে আসবেন না। কিন্তু ভুলে গেছি যে, ঢাকা মহানগরের বসতি কতটা বেড়েছে। যাদের অধিকাংশই খেটে-খাওয়া গরিব মানুষ। আবার চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। রেলওয়েতে এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও, কেন ট্রেনের সংখ্যা বাড়েনি? নাকি সেই চিন্তা করেননি কর্র্তৃপক্ষ? সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে শুধু বিদ্যমান ট্রেন, বাস, লঞ্চ দিয়ে যে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়া যাবে না, সেটা তাদের মাথায় আসেনি কেন? নাকি কর্র্তৃপক্ষ এটা ভেবেছেন, পরিবহনের ‘রাজা’রা ঈদে কামিয়ে নিক কোটি কোটি টাকা, হরণ করা হোক মানুষের প্রাণ, তাতে এমন কী ক্ষতি? সামনে কোরবানির ঈদ, সরকারকে এখনই পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা চাই, আর যেন কোনো মানুষ ঈদে বাড়িতে যাওয়ার সময় প্রাণ না হারায়। আর যেন ঈদযাত্রা অস্বস্তির না হয়।
