সর্বনাশী পদ্মায় বিষাদের ঢেউ

২৬ মরদেহ উদ্ধার, বেশিরভাগ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ এএম

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশিরভাগ মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হয়েছে তাদের দাফনও। কিন্ত স্বজন হারানোর বেদনা-বিষাদের ঢেউ এখনো পদ্মাপাড়ে। মহান স্বাধীনতা দিবসে যেখানে রাজবাড়ীর প্রতিটি মোড়ে উৎসবের আমেজ থাকার কথা, সেখানে আজ শোকের মাতম। স্বজনের সঙ্গে অনেক পরিবারের স্বপ্ন-আশা সব তলিয়ে গেছে সর্বনাশী নদীতে।

গত বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে প্রায় অর্ধশত যাত্রী-আরোহী নিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস। তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন জানালা-দরজা দিয়ে লাফিয়ে নামতে পারলেও বেশিরভাগ যাত্রীসহ বাসটি মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায় নদীতে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের চেষ্টায় বাসটি পন্টুনে তোলা হয়। সে সময় নারী ও শিশুসহ ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাস উদ্ধারের পরও নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যায় উদ্ধাকারী দল। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আরও কয়েকজনের সন্ধানে সন্ধ্যার আগেও চলছিল অভিযান।

গতকাল রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরদেহগুলো শনাক্ত করার পর ২৫টি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিহতের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে রাজবাড়ীর সদর উপজেলার ভবানীপুরে দাফন করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, তার মা ও ভাগ্নেকে। এ ছাড়া জেলার অন্য নিহতদের তাদের এলাকায় দাফন করার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন কুষ্টিয়ার চারজন। তারা হলেন, কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া খোকসা উপজেলার খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), একই উপজেলার ধুশু-ু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), একই উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)। তাদের নিজ নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। নিহতদের বাড়িতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আত্মীয়স্বজন।

বেঁচে যাওয়া এক যাত্রীর অভিজ্ঞতা : অবশ্য কুষ্টিয়ার আরেক যাত্রী বেঁচে গেছেন অলৌকিকভাবে। খাইরুল ইসলাম নামের ওই যাত্রী শুনিয়েছেন তার বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা। বাসটি ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে নিজের আসনে থাকা যাত্রী কীভাবে ভেতর থেকে নদীর পানিতে ছিটকে পড়েন এবং সাঁতরে এসে পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সাহায্যে উপরে ওঠেন তারই একটা শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার আমবাড়িয়া গ্রামের কুদ্দুস খাঁর ছেলে টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক খাইরুল খাঁ নিমজ্জিত বাস থেকে বেঁচে ফেরা সৌহার্দ্য পরিবহনের বি-২ সিটের যাত্রী ছিলেন।

খাইরুল বলেন, ‘বাসটি চালক নিজেই চালাচ্ছিলেন। এ সময় চালকের সহকারী ও সুপারভাইজার বাইরে থাকায় তারা প্রাণে বাঁচলেও বাসচালক আরমান খানের লাশ উদ্ধার করেছে উদ্ধারকারীরা। আমার পাশের বি-১ সিটে বসা ছিলেন সাদা রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। খোকসা স্ট্যান্ড কাউন্টার থেকে তিনি ওঠেছিলেন। বাসটি ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর ওই যুবক নেমেছিলেন আবার কয়েক মিনিট পর যুবকটি তার সিটে ফিরে আসলে তাকে বসতে দেওয়ার জন্য আমি সিট থেকে উঠে দাঁড়াই ঠিক ওই সময়ই বাসটি ফেরিতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ প্রচ- এক ঝাঁকুনি লাগে। এ সময় বাসের দরজা দিয়ে ছিটকে বাইরে নদীর পানিতে পড়ে যাই। ওই সময় আমি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী এবং কিছু ব্যাগ ব্যাগেজ পানিতে ভাসতে দেখি। নদীর পানিতে ভাসতে থাকা যাত্রীরা সাঁতরে ফেরি ও পন্টুনে দাঁড়ানো লোকজনের সাহায্যে পানি থেকে উঠে জীবন বাঁচায়’। তবে আমার পাশের সিটের ওই টি-শার্ট পরা যুবকের আর কোনো দেখা পাইনি। আমার যতটুকু মনে পড়ে এই বাসের প্রায় প্রতিটি সিটেই যাত্রী ছিল, তাদের অধিকাংশই নারী যাত্রী এবং তাদের সঙ্গে শিশু ছিল।

দুর্ঘটনাকবলিত বাসের খোকসা কাউন্টার মাস্টার রাকিব জানান, ‘ওই বাসের বি-১ ও ২ নম্বর আসনের যাত্রীরা খোকসা স্ট্যান্ডের কাউন্টারের যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে খাইরুল নামে এক যাত্রী বেঁচে ফিরেছেন। তবে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও এক বৃদ্ধ যাত্রী উঠেছিলেন তার কোনো সংবাদ এখনো পাইনি’।

রাজীবের ফোন আর আসবে না ফিরেছে লাশ : খোকসা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে বলেছিলেন, ‘ঢাকায় পৌঁছে ফোন দেব।’ সেই ফোন আর আসেনি। বরং কয়েক ঘণ্টা পর খবর আসে, রাজীব বিশ্বাস আর বেঁচে নেই। ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার খাগরবাড়িয়া গ্রামের রাজীব বিশ্বাস (৩২)। ঢাকার আশুলিয়ায় একটি ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে তিনি মার্কেটিং অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভরসা হয়ে উঠছিলেন তিনি ধীরে ধীরে। কিন্তু গত বুধবার বিকেলের দৌলতদিয়ার দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দেয় তার পথচলা।

বুধবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন রাজীব। ঈদের ছুটি শেষ, ফিরতে হবে কাজে। মায়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, ঢাকায় পৌঁছে খবর দেবেন। কিন্তু বিকেল গড়াতেই পরিবারের কাছে পৌঁছে যায় অন্য খবর। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে যে বাসে তিনি ছিলেন, সেটি পদ্মা নদীতে ডুবে গেছে। এরপর আর কোনো অপেক্ষা নয়, শুধু নিশ্চিত হয়ে ওঠা এক দুঃসংবাদ রাজীব আর ফিরবেন না।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শৈলডাঙ্গী মহাশ্মশানে দাহ করা হয় রাজীবের মরদেহ। চারপাশে স্বজনদের ভিড়, কিন্তু শব্দ নেই, স্তব্ধতা। সবাই বিশ্বাস করতে পারছে না, যে মানুষটি কিছু ঘণ্টা আগেও জীবিত ছিল, সে এখন নিথর। মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা হিমাংশু বিশ্বাস। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন রাজীব। এইচএসসি পাস করার পরই চাকরিতে ঢোকেন। গত দুই বছর ধরে আশুলিয়ায় কাজ করছিলেন। ছোট ভাই সজীব বিশ্বাসও ঢাকায় একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবা হিমাংশু বিশ্বাস কৃষিকাজ করেন, মা রেখা রানী বিশ্বাস গৃহিণী। এই পরিবারের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল রাজীবকে ঘিরে। হঠাৎ করেই সেই স্বপ্ন থেমে গেল।

রাজীব যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক আল মামুনও ছুটে আসেন খোকসায়। তিনি বলেন, ‘রাজীব খুব ভালো ও বিশ্বস্ত ছিল। কাজের প্রতি তার অনেক মনোযোগ ছিল। আমরা একজন ভালো কর্মী হারালাম।’

রাজীবের মা একটি ফোন কলের অপেক্ষা করছিলেন, যা আর কখনো আসবে না।

নিভে গেল আরমানের স্বপ্ন : বালিয়াকান্দি প্রতিনিধি জানান, ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত বাসচালক আরমান খানের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার-স্বজন, শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা।

বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের পশ্চিম খালকুলা গ্রামের বাসিন্দা আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩২) ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাস চালিয়ে ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ ব্রেক ফেল করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। গতকাল তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে ভেঙে পড়ে পরিবার। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, পুরো গ্রাম জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

আরমান খানের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। তার বড় মেয়ে আমেনা খাতুন শহীদ নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে তায়েবা খাতুনের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। স্ত্রী লাবনী খাতুন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তার চোখে এখন শুধু অশ্রু আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা।

লাবনী খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঈদের দুই দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। বলেছিলেন ঈদের সাত দিন পর বাড়ি আসবেন। কিন্তু বাড়ি তো ফিরলেন, লাশ হয়ে। আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত