দুবাইয়ে ধরা বেনজীর

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৫ এএম

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ অবশেষে ধরা পড়েছেন। দুবাই পুলিশের সহায়তায় ইন্টারপোলের একটি টিম আজমান শহরের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। ১২ জুন তাকে গ্রেপ্তার করলেও প্রকাশ পায় গতকাল রবিবার। গ্রেপ্তারের বিষয়টি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের দুবাই প্রতিনিধি দুবাই পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, ‘বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে রাখা হয়েছে। দুবাই পুলিশ তাকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাকে নানা বিষয়ে জেরা করা হচ্ছে।’

দেড় বছর আগে বেনজীর আহমেদের অবস্থান শনাক্তের পর আটক করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। আবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে গত বছরের এপ্রিলে ‘রেড নোটিস’ জারি করে ইন্টারপোল। এরপর তাকে নজরদারিতে রেখেছিল সংস্থাটি। নজরদারির বিষয়টি দুবাই পুলিশকেও অবহিত করা হয়েছিল।

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, চাকরি জীবনে বেনজীর আহমেদ ছিলেন খুবই প্রতাপশালী। তার ইশারায় চলত পুলিশ। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় তাকে অনেকেই সমীহ করে চলতেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও ছিল তার সুসম্পর্ক। চাকরির সুবাদে তিনি বেশিরভাগ সময়ই ঢাকায় ছিলেন।

দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে বেনজীর : আটকের পর বেনজীর আহমেদকে দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে আনা হয় বলে জানিয়েছেন দেশটির এক পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তর দুবাই প্রতিনিধিকে বলেন, বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে আজমান শহর থেকে। তার পরিবারের সদস্যরা ওই শহরে আছেন। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করে। নোটিসে বলা হয়েছে, তার নামে চারটি পাসপোর্ট আছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, টোকিও, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও কানাডায় সফর করেছেন। তাকে ইন্টারপোলসহ দুবাই পুলিশ জেরা করছে। তিনি কৌশলে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে। তাকে দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে রাখা হবে। তার দুবাইসহ আরও কিছু স্থানে জায়গা-জমি আছে। বিষয়গুলো আমরা তদন্ত করছি।

দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে : গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকার পক্ষে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে একটি ইমেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির মামলায় বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে। তাকে অতি দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : বেনজীর আহমেদ ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান। এরপর বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-কন্যাদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি সন্ধান মেলে, যা তার আয়ের তুলনায় অসম। দুর্নীতি ছাড়াও মতিঝিল শাপলা চত্বরের হত্যাকা-ের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। ওই সময় ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগবিরোধী মতাদর্শী নেতাসহ অন্যদের গুমের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। প্রতিবেদন বলা হয়, বেনজীর তার সম্পদবিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তার নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্র গ্রহণের পর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির নির্দেশ দেয় ঢাকার একটি আদালত । ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে দুদক। মামলাগুলোয় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের আইজি, ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন, তার আগে ডিএমপির কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ : ২০২৪ সালের ২৩ মে বেনজীর আহমেদের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত। সেই সঙ্গে তার ২৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ আর্থিক লেনদেনকারী মোট ৩৩টি অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। বেনজীরের বিপুল সম্পদের মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জের সাহাপুর ইউনিয়নে সাভানা ইকো রিসোর্ট নামে অভিজাত ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ছয়টি কোম্পানি, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা, ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে দামি ফ্ল্যাট, বাড়ি আর ঢাকার কাছের এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি আছে। দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানে আছে দুই লাখ শেয়ার। এ ছাড়া পূর্বাচলে আছে ৪০ কাঠার সুবিশাল জায়গাজুড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, একই এলাকায় আছে ২২ কোটি টাকা মূল্যের আরও ১০ বিঘা জমি। তাছাড়া বেনজীর পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে প্রায় ৬০০ বিঘা জমি রয়েছে, যার বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের। তার স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে একটি সাততলা বাড়ি ও বেনজীরের নামে ভাটারায় একটি চারতলা বাড়ি আছে। পাশাাপাশি মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান ও কক্সবাজারে অনেক জমি আছে বলে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যেভাবে দেশ ছাড়েন বেনজীর : ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেনজীর আহমেদের বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ওই বছরের ৪ মে রাত পৌনে ১২টার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশত্যাগ করেন তিনি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে ওঠার জন্য শেষ সিকিউরিটি চেকের জন্য যাচ্ছেন। তার পরনে ছিল সোনালি রঙের একটি হাফ শার্ট, অ্যাশ কালারের প্যান্ট ও কালো পাদুকা। ওই সময় পরিবারের কেউ ছিলেন না। তার স্ত্রী-সন্তানদের আগেই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন তিনি।

যে প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হতে পারে : পুলিশ সদর দপ্তরের দুইজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইন্টারপোলের সহায়তায় এর আগে আসামি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ মে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই থেকে হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকারকে দেশে ফিরিয়ে আনে পিবিআই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দ-িত আসামি ফিরিয়ে আনার চুক্তি আছে বাংলাদেশের। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো অপরাধীকে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করলে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা যায়। এ ছাড়াও সরকার এবং চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত অন্য কোনো পদ্ধতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্মতিতে যেকোনো ব্যবস্থায় অপরাধীদের ফেরাতে পারে বাংলাদেশ। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল শিগগির দুবাই যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত