ব্রাজিলকে নাচিয়েছে মরক্কো

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৫ এএম

নিউ ইয়র্ক/নিউজার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন হলুদ আর লাল জার্সির এক মহাসমুদ্র। টাইমস স্কয়ারের উন্মাদনা মাঠের ঘাসে আছড়ে পড়ার আগেই ম্যাচটিকে ঘিরে চড়ছিল পারদ। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর পর দেখা গেল এক ভিন্ন চিত্র। কার্লো আনচেলত্তির জাদুকরী স্পর্শে যে নতুন সেলেসাওদের দেখার অপেক্ষায় ছিল ফুটবল বিশ্ব, প্রথম ম্যাচেই তারা খেলো এক বড় ধাক্কা। তীব্র তাপপ্রবাহে নজিরবিহীন এক শুরুর একাদশ, মাঝমাঠের ছন্নছাড়া ফুটবল আর বোঝাপড়ার চরম অভাবে গ্রুপ ‘সি’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছেড়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রথমার্ধে মরক্কোর রূপকথার ফুটবলের সামনে একপ্রকার ‘একাই’ লড়ে ব্রাজিলের হারের লজ্জা বাঁচালেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

ম্যাচের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ব্রাজিলের মাঝমাঠ। মরক্কো বারবার অবিশ্বাস্য সহজে ব্রাজিলের মিডফিল্ড লাইন ভেদ করেছে। ‘বিটুইন দ্য লাইনে’ মরক্কো স্পেস পেয়েছে বেশ, কিশোর আইয়ুব বুয়াদ্দি এবং বিলাল এল-খান্নুস ছন্দময় পাস খেলে গেছেন অনায়াসে। কাসেমিরো এই ম্যাচে ছিলেন সম্পূর্ণ অকার্যকর; প্রেস ভাঙতে কিংবা বল পুনরুদ্ধার করতে কিছুতেই তাকে চেনা ছন্দে দেখা যায়নি। তার এতটাই বাজে পারফরম্যান্স হয়েছিল যে হাফ টাইমেই তাকে মাঠ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

ব্রাজিলের গোল হজমের দৃশ্যটি ছিল কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত হতাশার। লুকাস পাকেতা মিডফিল্ডে বল হারান। এরপর ব্রাহিম দিয়াজ ইসমাইল সাইবারিকে থ্রু-বল দেন এবং সেন্টার-ব্যাক মারকিনিয়োস ও গাব্রিয়েল দুজনেই ছিলেন অপ্রস্তুত। দুজনের মধ্যে ফাঁকা জায়গা ছিল বেশ, হাইলাইন সামলানোর মতো প্রয়োজনীয় গতি দুজনের কারোরই ছিল না। এটি একটি মৌলিক ডিফেন্সিভ ভুল, যা এই মানের দলে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সাইবারির গোলের মুহূর্তে গোলকিপার আলিসনের পোস্ট থেকে বেরিয়ে আসার টাইমিং ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তার এই অসময়ের চার্জ পুরো পরিস্থিতিটিকে আরও সহজ করে দিয়েছিল সাইবারির জন্য, যিনি শান্তভাবে বল লব করে জালে পাঠান। আলিসন পেছনে থাকলে শট নিতে আরেকটু ভাবতে হতো সাইবারিকে, পেছন থেকে ডিফেন্ডাররাও তাকে ট্যাকল করার সুযোগ পেতেন। তবে তিনি অপ্রয়োজনে এগিয়ে আসায় পরিস্থিতি হয়ে যায় আরও কঠিন।

আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেছেন যে মরক্কো বারবার ব্রাজিলের প্রেস ভেঙে বিপজ্জনক কাউন্টার-অ্যাটাকে গেছে। ব্রাজিল হাই প্রেস দিতে গিয়ে বারবার ফাঁদে পড়েছে। মরক্কো ধৈর্যের সঙ্গে ফ্ল্যাঙ্ক থেকে বল সামনে নিয়ে গেছে, হাকিমি এগিয়ে গেছেন ডান দিক থেকে এবং এল-খান্নুস ব্রাজিলকে বিপদে ফেলেছেন বাম দিক থেকে। ব্রাজিলের উইং-ব্যাকরা রক্ষণে এবং আক্রমণে দুই দিকেই যথেষ্ট কভারেজ দিতে পারেননি। বিশেষ করে রাইট-ব্যাকে রজার আইবেনিজকে খেলানোর জুয়াটি শুরুতেই মার খায়।

ব্রাজিলের সমতাসূচক গোলটি এসেছে একেবারেই ব্যক্তিগত প্রতিভার ঝলক থেকে। এতে দলগত কৌশল ছিল অনুপস্থিত। শুধু কি এই গোলে, পুরো ম্যাচেই তো এমন কিছুর দেখা মেলেনি! ভিনি জুনিয়রের অসাধারণ একটি মুহূর্ত পুরো প্রথমার্ধের বাজে ফুটবলকে ঢেকে রেখেছে। ইগোর থিয়াগো ১৪ মিনিটে সহজ হেডার মিস করেছেন। দলগতভাবে স্পষ্ট গোলের সুযোগ তৈরি করতে ব্রাজিলকে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

আনচেলত্তি নিজেই বলেছেন দল শুরুতে ‘নার্ভাস’ ছিল। বলের দখল বারবার হারানো, অপ্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জে বাজে সিদ্ধান্ত, কিংবা গোলরক্ষক আলিসনের এগিয়ে আসা... এগুলো মানসিক প্রস্তুতির অভাবের লক্ষণ। এসব কারণেই ব্রাজিল খাবি খেয়েছে মরক্কোর বিপক্ষে।

শিষ্যদের এই মানসিক চাপ ও মাঠের অস্থিরতা নিয়ে কোচ কার্লো আনচেলত্তি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা মাঠের ভেতরে অস্থিরতার কথা বলেছে। আমাদের এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। এমন বড় মঞ্চে চাপ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে ধীরে ধীরে আমরা এই জায়গাটায় উন্নতি করব।’

কাতারে গত বিশ্বকাপের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রাজিলের ক্যামএ ওলটপালট হয়েছে অনেক কিছু; দলে ডাক পেয়েছেন ৯০ জনেরও বেশি ফুটবলার। তবে আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর দলে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও মরক্কোর বিপক্ষে তার কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, সাধারণ সেন্ট্রাল ডিফেন্সে খেলা রজার ইবেনিজকে রাইট-ব্যাক পজিশনে খেলানোর জুয়াটি শুরুতেই মার খায়। মরক্কোর ‘অ্যাটলাস লায়ন্সরা’ ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই আইবেনিজের সেই দুর্বল প্রান্তটিকে পাখির চোখ করে একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে।

মাঝমাঠে অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরো এবং ব্রুনো গিমারেস দুজনেই মরক্কোর মাঝমাঠের গতি রুখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। বিশেষ করে মরক্কোর মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক আইয়ুব বুয়াদ্দির মাঝমাঠ কাঁপানো ফুটবল সেলেসাওদের রক্ষণকে ছায়ার পেছনে ছুটতে বাধ্য করেছিল। ম্যাচের শুরুর একাদশ নিয়ে সমর্থকদের তীব্র সমালোচনার মুখে আনচেলত্তি যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘একাদশটি বেশ ভেবেচিন্তেই নামানো হয়েছিল, কারণ আমরা এটি নিয়েই অনুশীলন করেছিলাম। আমার মনে হয় না এই সমালোচনা কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে; বরং এই সমালোচনা পুরো দলের বিরুদ্ধে, যারা প্রথমার্ধে ভালো খেলতে পারেনি।’

তীব্র গরমে রেফারি যখন ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ (পানি পানের বিরতি) দিলেন, সেটি ব্রাজিলের জন্য কৌশল বদলানোর দারুণ সুযোগ করে দেয়। আনচেলত্তি তার ৪-২-৪ ফরমেশন বদলে ৪-২-৩-১-এ রূপান্তর করেন। রাফিনহাকে ডানে পাঠিয়ে লুকাস পাকেতাকে মাঝমাঠে নিয়ে আসা হয়। এর পরপরই ব্রুনো গিমারেসের পাস থেকে বল পেয়ে বাঁ-দিক থেকে মরক্কোর ডিফেন্ডার এল আইনাউইকে মাটিতে ছিটকে ফেলে, এক সাংঘাতিক কোনাকুনি শটে সমতা ফেরান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। জাতীয় দলের হয়ে ৫০তম ম্যাচে এটি ভিনির মাত্র ১০ম গোল।

ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের পর্যালোচনা নিয়ে ভিনিসিয়ুস বলেন, ‘খেলার শুরুতেই গোল হজম করার পর আমাদের পুরো প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনাটাই বদলে গিয়েছিল। তবে আমি বিশ্বাস করি, গোল খাওয়ার পরপরই আমরা দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। আমাদের মার্কিংয়ের উন্নতি হয়েছিল। রাফিনহা তার দিক পরিবর্তন করার পর আমরা খেলাটা আরও একটু ছড়াতে পেরেছিলাম এবং বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলাম।’

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আনচেলত্তি তার ভুল স্বীকার করে হলুদ কার্ড দেখা ইবেনিজ ও ক্যাসেমিরোকে তুলে নিয়ে দানিলো ও ফাবিনহোকে মাঠে নামান। পরে নামানো হয় লুইজ হেনরিকে ও ম্যাথিউস কুনহাকে। ম্যাচে কৌশল বা খেলোয়াড় বদল করতে আনচেলত্তি অনেক দেরি করেছেন এমন সমালোচনার জবাবে আনচেলত্তি বলেন, ‘ ৪৫ মিনিটে দুটি পরিবর্তন করেছি এবং ৫৯ মিনিটে আরেকটি পরিবর্তন করেছি। আপনারা কি বুঝতে পারছেন? ৪৫ মিনিটে দুটি এবং ৫৯ মিনিটে একটি। আমার মনে হয় না আমি পরিবর্তন করতে কোনো সময় নষ্ট করেছি।’

তবে পুরো ম্যাচে আশ্চর্যজনকভাবে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে তরুণ সেনসেশন এনড্রিককে। তাকে কেন খেলানো হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো একক খেলোয়াড়কে নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি কোচ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে কোচের বিশেষ নির্দেশনা নিয়ে ভিনি বলেন, ‘কোচ আমাদের বল আরও বেশি নিজেদের হোল্ড করতে (ধরে রাখতে) এবং মাঠে আরও বেশি মুভমেন্ট বা নড়াচড়া করতে বলেছিলেন। আমার মনে হয় আমরা সেটা করতে পেরেছিলাম। তবে আমরা এর চেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারিনি কারণ মরক্কো খুব দুর্দান্ত ডিফেন্স করেছে।’

আমেরিকার মেটলাইফ স্টেডিয়ামের কন্ডিশন ও তীব্র গরমও যে ব্রাজিলের স্বাভাবিক খেলায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা ভিনির কথাতেই স্পষ্ট, ‘এখানকার মাঠের পরিবেশ একদম আলাদা, তার ওপর প্রচণ্ড গরম। আমাদের দ্রুত এই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। গত বিশ্বকাপে আমি বেশ তরুণ ছিলাম। কিন্তু আজ আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি, সেই সঙ্গে চাপও বেশি। তবে সামনে যা কিছুই আসুক না কেন, তার সবকিছুর জন্যই আমি প্রস্তুত।’

ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে প্রায় জিতেই যাচ্ছিল মরক্কো। দূর থেকে নেওয়া একটি জোরালো শট অ্যালিসনের হাত থেকে ফসকে গেলে ফিরতি বলের রিবাউন্ড শট আসে। তবে পরপর দুইবার চমৎকার দক্ষতায় শরীর ছুড়ে দিয়ে ব্রাজিলের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকান অ্যালিসন বেকার।

এই ড্র ব্রাজিলের মতো দলের ড্রেসিংরুমের মনোবল ভেঙে দেবে কি না এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘একেবারেই না। অনেক কারণেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি মনের মতো নাও হতে পারে। তবে আমাদের সামনে তাকাতে হবে, পরের ম্যাচের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের আসল লক্ষ্য হলো গ্রুপ পর্ব পার হয়ে নকআউটে যাওয়া এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের উন্নত করা।’

দলের এমন নড়বড়ে পারফরম্যান্সে সমর্থকরা হতাশ হলেও নিজের দলের ওপর পূর্ণ আস্থা হারাচ্ছেন না এই মাস্টারমাইন্ড। আনচেলত্তির শেষ ভাষ্য, ‘দলের ওপর আমার শতভাগ আস্থা আছে। ফুটবলে সবকিছু সবসময় নিখুঁতভাবে হয় না। যখন কোনো কিছু ঠিকঠাক কাজ করে না, তখন জিনিসগুলো আরও উন্নত করার জন্য গঠনমূলক সমালোচনা করা দরকার। এই পথচলা তো কেবল শুরু হলো। ছেলেরা শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমরা এই ফলাফলটি মেনে নিচ্ছি, এটি এতটাও খারাপ নয়। মনে রাখবেন, প্রথম ম্যাচেই কেউ বিশ্বকাপ জিতে যায় না।’

নতুন নিয়মে সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও পরের রাউন্ডে যাবে, তাই ব্রাজিলের নকআউট পর্বে যাওয়া হয়তো আটকাবে না। তবে বিশ্বজয়ের হেক্সা মিশন সফল করতে হলে ব্রাজিলকে বড্ড বেশি উন্নতি করতে হবে। ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির বিপক্ষে সেলেসাওদের পরবর্তী ম্যাচ। গ্রুপে শীর্ষস্থান ধরে রাখা এবং গোল ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সেই ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে বড় ব্যবধানে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত