কাঠামোগত হত্যাকান্ড

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

দেশের বাতাসে এখন উৎসবের আমেজ নয়, বরং লাশের গন্ধ। ঈদের আগে-পরে এ দেশে এক মারণঘাতী জাদুর খেলা শুরু হয়। যে মানুষটি বুকভরা আনন্দ নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ান, তিনি জানেন না তার গন্তব্য প্রিয়জনের কোল, নাকি হিমশীতল মর্গ। যাতায়াত ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে তাসের ঘরের মতো, তখন রাষ্ট্র সেখানে উদাসীন ও পাথুরে দর্শক। যেন সড়ক, রেল আর নদীপথে লাশের স্তূপ গুনে পরিসংখ্যানের খাতা ভারী করা প্রশাসনের প্রধান কাজ। আমরা কথায় বলি ‘ঈদ আনন্দ’। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘সিস্টেমিক কিলিং’ বা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। প্রতি বছর ঈদ আসে, ঈদ যায়। কিন্তু যাতায়াত পথ যেন খোলা গণকবরে পরিণত হয়। এই অব্যবস্থাপনা এখন ঘাতকের সম্মতির নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদরঘাটে ৫ জন মানুষের প্রাণ চলে যাওয়াকে যখন রাষ্ট্র কেবল ‘দুর্ঘটনা’র তকমা দিয়ে ফাইল চাপা দিই, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য এখানে ফুটপাথের ধুলোর চেয়েও সস্তা। কেবল সড়কে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক বাসডুবি বা নৌপথ নয়, দুর্গম পাহাড় থেকে শুরু করে আধুনিক রেলপথ সর্বত্র দুর্ঘটনার থাবা। খাগড়াছড়ির গিরিখাদে বাস উল্টে পড়া কিংবা চলন্ত ট্রেনে আগুনের শিখা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যাতায়াতের পথ আর নিরাপদ নয়। জনপদে মৃত্যুর মহোৎসব প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের জন্য সব পথ আজ বন্ধ। উৎসবের ডামাডোলে আমরা কি তবে সজ্ঞানেই একেকটি কফিনে, রাষ্ট্রীয় সিলমোহর বসিয়ে দিচ্ছি?

আমরা যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মেগা প্রজেক্টের উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছি, তখন সদরঘাটের একটি ছিঁড়ে যাওয়া রশি প্রকৃত সক্ষমতার কঙ্কালটা বের করে দেয়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যখন যাত্রীভর্তি বাস নদীর পেটে চলে যায় পিচ্ছিল পন্টুনের কারণে, তখন স্পষ্ট হয় আমাদের উন্নয়ন এবং দায়বদ্ধতা কতটুকু আন্তরিক? তদারকি সংস্থাগুলোর চোখে কি ঠুলি পরা, নাকি তারা এই মৃত্যুর মিছিলকে স্বাভাবিক মেনে নিয়েছে? যেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা দুর্নীতি তৈরি করেছে একেকটি নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ। দেশের হাইওয়েগুলো এখন অদক্ষ, নেশাগ্রস্ত চালক আর ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের এক উন্মত্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিআরটিএ নামক সংস্থাটি লাইসেন্স বিলি করার ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করে, তা অনেক ক্ষেত্রে ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’ সই করার মতোই ভয়ানক। অদক্ষ চালক আর যান্ত্রিক ত্রুটি যখন পাহাড়ি বাঁকগুলোতে কাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই দায় কার? কেন এই অযোগ্য লোকগুলো রাজপথে দাপিয়ে বেড়ায়? তাহলে কি পর্দার আড়ালে অর্থের লেনদেন চলছে? আবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এক ‘নীরব মহামারী’র রূপ নিয়েছে। কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে গিলে খাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রাজপথ। সড়ক, রেল, লঞ্চ ও স্টিমারে যখন আতঙ্ক ভর করে, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার কোনো নিরাপদ জায়গা থাকে না। স্টেশন থেকে শুরু করে ট্রেনের ভেতর পর্যন্ত যে নিিদ্র নিরাপত্তার কথা বলা হয়, আগুনের লেলিহান শিখা সেই দাবিকে বারবার উপহাস করছে। এ কি শুধুই অবহেলা, নাকি নিবিড় তদারকির অভাব? নৌপথের চিত্র বীভৎস এবং অমানবিক। একটি লঞ্চে যেখানে আইনত শখানেক মানুষের জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে মুনাফালোভী মালিকরা ক্ষমতার জোরে তিন থেকে চারশ মানুষকে গাদাগাদি করে তোলেন। জীবন এখানে মুনাফার কাছে তুচ্ছ।  কোনো প্রভাবশালী রাঘববোয়ালের কোনো দিন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে?

সড়ক, রেল বা নৌপথের দুর্ঘটনাকে আমরা ‘ভাগ্য’ বা ‘তকদির’ বলে সান্ত্বনা খুঁজি। কিন্তু অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, এসবের সিংহভাগ মানুষের তৈরি দুর্যোগ। একে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ বলা অধিক যুক্তিযুক্ত। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। মানুষের চেয়ে যখন সিমেন্ট আর লোহার অবকাঠামো বড় হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র তার মানবিক গুণাবলি হারায়।  লাশের মিছিল থামাতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, বরং যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সে লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা : ১. বিআরটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের আমূল সংস্কার : লাইসেন্স বাণিজ্য ও ফিটনেস জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণ যানের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। ২. চাঁদাবাজিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত হাইওয়ে : মহাসড়কের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নামে চলা সব ধরনের অবৈধ চাঁদা আদায় বন্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। ৩. ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট নির্মূল : ঈদ বা উৎসবের সুযোগে বাস, লঞ্চ ও বিমানের ভাড়ার যে গলাকাটা  নৈরাজ্য চলে, তা কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। সিন্ডিকেটের হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৪. আধুনিক প্রযুক্তিগত নজরদারি : প্রতিটি ফেরিঘাট, পন্টুন এবং মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হাইস্পিড নাইটভিশন ক্যামেরা এবং জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করে সার্বক্ষণিক ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ৫. রেলপথের নিিদ্র ও অগ্নিনিরাপত্তা : নাশকতারোধে রেলপথে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং রেললাইনে বিশেষ পাহারা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি বগিতে আধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমন পথ সচল রাখতে হবে। ৬. পেশাদার সেফটি ইন্সপেক্টর নিয়োগ : লঞ্চের রশি, ফেরির র‌্যাম্প বা বাসের ব্রেকিং সিস্টেমের মতো কারিগরি বিষয়গুলো প্রতিদিন ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য প্রতিটি টার্মিনালে স্বাধীন ও দক্ষ ‘সেফটি ইন্সপেক্টর’ নিয়োগ দিতে হবে। ৭. পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের বিশেষ সুরক্ষা : খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে অত্যাধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং ক্র্যাশ ব্যারিয়ার স্থাপন করতে হবে। এসব রুটে কেবল পাহাড়ে গাড়ি চালাতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকদেরই অনুমতি দিতে হবে। ৮. বিচারের দৃষ্টান্ত ও ট্রাইব্যুনাল গঠন : সড়ক ও নৌনিরাপত্তা আইন অমান্যকারী মালিক ও চালকদের বিচারে বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। ৯. তদন্ত কমিটির জবাবদিহি প্রকাশ : প্রতিটি দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সুপারিশগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ১০. মহাসড়কের প্রতি ৫০ কিলোমিটার অন্তর আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসহ ‘ট্রমা সেন্টার’ এবং দ্রুত উদ্ধার কাজের জন্য সার্বক্ষণিক ‘এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’ বা রেসকিউ টিম মোতায়েন রাখতে হবে এবং ১১. প্রত্যেক চালকের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ঈদ মানে মিলন, কিন্তু আমাদের দেশে ঈদ মানে এখন বিচ্ছেদ আর হাহাকার। রক্তের দাগহীন ঈদ কি আমরা পাব না? উৎসবের রঙে যখন সাধারণ মানুষের তাজা রক্তের দাগ মিশে যায়, তখন সেই রাষ্ট্রকে আর ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ বলা চলে না। উন্নয়নের বড় বড় সেøাগান ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থহীন, যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ নিরাপদে তার বাড়িতে পৌঁছাতে পারে। প্রাণের বিনিময়ে কোনো জিডিপি বড় হতে পারে না। আবারও বলি, আপনি আজ বাড়ি ফিরতে পেরেছেন? আপনার প্রিয়জনের মুখ দেখতে পাচ্ছেন? তবে পরম করুণাময়ের কাছে শুকরিয়া আদায় করুন। কারণ এই অব্যবস্থাপনার দেশে আপনার বেঁচে থাকাটা কেবলই একটা ‘দুর্ঘটনা’ যে, আপনি এখনো মরেননি। অপমৃত্যু যেখানে স্বাভাবিক নিয়ম, সেখানে বেঁচে থাকাটাই চরম অস্বাভাবিকতা। আমরা আর এভাবে বাঁচতে চাই না। আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। ঈদ উৎসবের রঙে যখন সাধারণ মানুষের রক্তের দাগে মিশে যায়, তখন কাদের দায় দেব? আমরা চাই নিরাপদ পথ, নিরাপদ যাত্রা এবং রক্তদাগহীন এক আনন্দময় ঈদযাত্রা। আমরা আর ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না। চাই না প্রতিটি যাত্রার আগে পরিবারের সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার আশঙ্কা বুকে নিয়ে বের হতে। চাই এমন এক পরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপত্তা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে নিশ্চিত হবে। যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যেখানে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। আমরা চাই প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং এমন কার্যকর ব্যবস্থা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।

আমরা চাই এমন এক ঈদ, যেখানে আনন্দের রঙে কোনো রক্তের দাগ থাকবে না, যেখানে কান্নার শব্দ নয়, শোনা যাবে হাসির প্রতিধ্বনি। আমরা চাই প্রিয়জনদের সঙ্গে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা, চাই স্বাভাবিক মৃত্যু। যা ভয়হীন, নিরাপদ এবং মানবিক জীবনের অধিকার। ঈদের মতো আনন্দ উৎসবে থাকার কথা ছিল ভালোবাসা, মিলন আর খুশির রঙ সেখানে আজ মিশে যাচ্ছে মানুষের রক্তের দাগ। এই শোক, এই কান্না, এই আর্তনাদ কোনো পরিসংখ্যান নয়, এগুলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সেটি কি কেউ দেখে!

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত