আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা কে ছিলেন? জর্জ ওয়াশিংটন কি সবকিছু ছিলেন? তিনি মূলত সামরিক নেতা। সেখানে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন কূটনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক নেতা থমাস জেফারসন এবং জন অ্যাডামসের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি, ততটা জনপ্রিয় না হলেও, আমেরিকানদের কাছে জর্জ ওয়াশিংটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের কালেক্টিভ লিডারশিপ দেখা যায়। তবে একক নেতৃত্ব যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, ১৯৬৩ সালের অহিংস আন্দোলনে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা। বলশেভিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে আবার কালেক্টিভ লিডারশিপের চিত্র দেখা যায়। লেনিনকে সাধারণত বিপ্লবের মুখ হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল দলভিত্তিক সমন্বিত নেতৃত্বের ফল। লিও ট্রটস্কি সামরিক সংগঠন ও রেড আর্মি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন; স্ট্যালিন সংগঠনগত ক্ষমতা ও পার্টির ভেতরের কাঠামো শক্তিশালী করেন; আর কামেনেভ ও জিনোভিয়েভসহ অন্য নেতারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিলেন। অর্থাৎ, এটি কোনো একক ব্যক্তির নেতৃত্বে নয়; বরং আদর্শভিত্তিক দলের যৌথ প্রয়াসে সংঘটিত বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবের শুরুটা ছিল আরও বেশি বিকেন্দ্রীভূত ও জটিল। এখানে প্রথম দিকে কোনো নির্দিষ্ট নেতা ছিল না; বরং সামাজিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক বৈষম্য মিলিয়ে এই গণঅভ্যুত্থান তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যেমন জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে রবেসপিয়ের একটি সময়ের জন্য প্রভাবশালী হয়ে উঠলে, পুরো বিপ্লবকে তার একার নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বরং এটি ছিল এক ধরনের ‘শিফটিং লিডারশিপ’, যেখানে পরিস্থিতি অনুযায়ী নেতৃত্ব বদলেছে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোন ধরনের বিপ্লব ছিল? কোন ধরনের যুদ্ধ ছিল? একক নেতৃত্বের, নাকি যৌথ নেতৃত্বের? নাকি শিফটিং লিডারশিপধর্মী? একক দলের, নাকি বহুদলীয় ও বহু বাহিনীর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা ঠিকভাবে খুঁজে নিতে পারি, তবে শুধু ঐতিহাসিক ভুলগুলোরই মীমাংসা হবে না; সমকালীন রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করতেও সুবিধা হবে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের আগেই, পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিভিন্ন ধারায় স্পষ্টভাবে উত্থাপিত হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় মওলানা ভাসানী সরাসরি স্বাধীনতার আহ্বান জানান। একই সময় বামপন্থি সংগঠনগুলো ‘অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’- সেøাগানে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির কথা বলতে শুরু করে। অন্যদিকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘নিউক্লিয়াস’ গোপনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা, প্রতীক ও সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে কাজ করছিল। ২৫ মার্চের প্রাক্কালে পল্টনের জনসভায় বিপ্লবী ধারার নেতারা গেরিলা যুদ্ধের আহ্বান জানান। অর্থাৎ, স্বাধীনতার ডাক কোনো একক মুহূর্ত বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা, নেতা ও সংগঠনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন, স্বাধীনতার দাবি এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’। একই ভাষণে তিনি পাকিস্তানিদের আলোচনার টেবিলে বসার আমন্ত্রণ জানান। অথচ তখনই সারা দেশে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে সময় তার এই ভাষণের অস্পষ্টতা নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলেছিলেন। যে অস্পষ্টতা এখন বিভিন্ন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে শেখ মুজিবের নিজস্ব মূল্যায়ন রয়েছে। পৃথিবী বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাক্ষাৎকারে তা উঠে এসেছে। ভারত সরকার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস ভলিউম-২-এর ৬১৪ থেকে ৬২৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রস্ট সেই সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি বলতেন, আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দিচ্ছি, তো কী ঘটত?’ মুজিব বলেন, ‘বিশেষ করে ওই দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে আমি এ বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, তারা বলুক মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আমি চাচ্ছিলাম, তারাই আঘাতটা হানুক এবং আমরা জনগণ তা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’ ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন আহমদ যখন টেপ রেকর্ডার নিয়ে মুজিবের বাসায় হাজির হন, তখনো তিনি স্পষ্ট ঘোষণা রেকর্ড করে দেননি। এক লাইনের যে টেলিগ্রামটি করা হয়, সেটিও ৭ মার্চের ভাষণের মতোই অস্পষ্ট। অথচ সে সময় তার কণ্ঠের প্রয়োজনীয়তা তাজউদ্দীন উপলব্ধি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের কেন্দ্র চলে যায় তাজউদ্দীনের হাতে। এই পর্যায় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে একটি শিফটিং লিডারশিপের উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। কারণ, এর আগে ছয় দফা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান যে ধরনের দৃঢ় ভূমিকা রেখেছিলেন, মার্চ মাসে আমরা তাকে সেই একইভাবে দেখতে পাই না। যদিও যুদ্ধের পর তিনি আবার নেতৃত্ব নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। একাত্তরে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা নেতৃত্ব শূন্য জাতিকে যে সাহস জুগিয়েছিল, তা শুধু অস্ত্রের সাহস নয় মানসিক শক্তি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার কালেক্টিভ লিডারশিপে যেমন জর্জ ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তাজউদ্দীন বা অন্য নেতাদের মতো তাৎপর্যপূর্ণ। কালেক্টিভ লিডারশিপে কারও অবদান খাটো করে দেখা অনুচিত। কালেক্টিভ ও শিফটিং লিডারশিপ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্দোলন-সংগ্রামে নানা ধরনের নেতৃত্ব দেখা যায়। এই উদাহরণগুলো সামনে এলে বাংলাদেশকে সরলভাবে একক, কালেক্টিভ বা শিফটিং লিডারশিপের একটিমাত্র কাঠামোয় সীমাবদ্ধ করে দেখা কঠিন। তখন মানুষ জটিল বিষয়গুলোকে আরও সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামেও আমরা একইসঙ্গে আইকনিক ও সমষ্টিগত নেতৃত্বের একটি মিশ্র রূপ দেখি। হো চি মিন আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হলেও, সামরিক কৌশলে জেনারেল ভো গুয়েন জিয়াপের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে একজন প্রতীকী নেতা থাকলেও, বাস্তব সাফল্য এসেছে যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্ব জুড়ে আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠলেও, অলিভার টাম্বো, স্টিভ বিকোসহ আরও অনেক নেতা ভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ম্যান্ডেলা কারাবন্দি থাকার সময় আন্দোলন থেমে যায়নি; বরং অন্য নেতারা সেটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ফলে এখানে ব্যক্তির চেয়ে আন্দোলন নিজেই বড় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের রিপাবলিকান পক্ষ একটি ভিন্ন ধরনের উদাহরণ। এখানে বিভিন্ন বামপন্থি দল, শ্রমিক সংগঠন ও অ্যানার্কিস্ট গোষ্ঠী একসঙ্গে লড়াই করলেও, কোনো একক বা শক্তিশালী সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মতবিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়। এই উদাহরণটি দেখায় যে, বহুনেতৃত্ব থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না; কার্যকর সমন্বয় ও ঐক্য না থাকলে তা ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে। এই সব উদাহরণ মিলিয়ে বোঝা যায়, ইতিহাসে সফল অনেক আন্দোলন একক নেতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং সেগুলোতে বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন ভূমিকায় একাধিক নেতা কাজ করেছেন। কেউ সামরিক, কেউ রাজনৈতিক, কেউ কূটনৈতিক। অর্থাৎ, নেতৃত্ব ছিল একটি প্রক্রিয়া; কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়। শেখ মুজিবকে একমাত্র স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আ.লীগ এখনো যেভাবে সক্রিয়, তাতে মনে হয় তারা আ.লীগ এবং মুজিবকে আবার হত্যা করবে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও মৃত্যু বিএনপিকে কিছুটা আলোচনায় এনেছিল, কিন্তু তারা সেটিকে সরাসরি রাজনৈতিক সহানুভূতিতে রূপ দেয়নি। জিয়াউর রহমানও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কিন্তু এটাকে তারেক রহমান ‘স্বজন হারানোর বেদনা’ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি পিতার ১৯ দফা কর্মসূচি থেকে বর্তমান সময়ের কিছু কর্মসূচিকে নিজের কর্মসূচির মধ্যে রেখেছেন। যেমন- খাল খনন, স্বনির্ভর প্রকল্প ও গ্রামসরকার ধারণা।
ন্যারেটিভ এবং বয়ান প্রতিষ্ঠার বদলে তারা নির্বাচনী ইশতেহারের ৯টি প্রতিশ্রুতি এবং দলীয় ৩১ দফা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। ভোটের কালি মোছার আগেই তারা ইশতেহারের ৯টি প্রতিশ্রুতি দৃশ্যমান করছে। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তাদের রাজনৈতিক আদর্শ হলেও, কল্যাণমুখী রাষ্ট্রই এ মুহূর্তে তাদের বয়ানের বিকল্প হয়ে উঠছে। ইতিহাস, চেতনা এবং বয়ানবাজি ছাড়াও যে রাজনীতি করা যায় তা বিএনপিকে দেখলে কিছুটা অনুমান করা যায়। এই ধারবাহিকতা বিএনপি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বিভিন্ন সময় শেখ মুজিবকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছেন এমন উদাহরণ রয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে স্মৃতিচিহ্ন ও প্রতীক নিয়ে বিরোধও আমরা দেখেছি। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সমাজে বিভাজনই বাড়ায়। আ.লীগের বয়ানে সবসময়ই ভাসানী, তাজউদ্দীন বা জিয়ার মতো নেতাদের অবদান উপেক্ষিত হয়ছে। কখনো কখনো তাদের অবদানকে উল্টো প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে এই ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। পুরো দেশ যখন নেতৃত্বশূন্য, মুজিবনগর সরকার গঠনের আগের সময়টিতে, তখনো বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব কাজ করেছে, যার মধ্যে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ইতিহাসকে শ্রেণি, উৎপাদন সম্পর্ক ও বাস্তব বস্তুগত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করার কথা থাকলেও, এখানে অধিকাংশ সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাই প্রাধান্য পেয়েছে। সমাজতান্ত্রিক হওয়ার পরও কেন তারা জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবকে সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নিয়েছে, এটি প্রশ্নসাপেক্ষ এখনো। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে কি তাদের কিছু নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত, নাকি দলের কৌশলগত অবস্থান, নাকি তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা? এসব ত্রিমাত্রিক দ্বৈততা তাদের রাজনীতিকে একদিকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করলেও, অন্যদিকে তাদের মার্কসবাদী অবস্থানের ভেতরে একটি স্পষ্ট টানাপড়েন তৈরি করে। ইতিহাসকে তার জটিলতা ও বহুমাত্রিকতার মধ্যে বোঝা উচিত।
লেখক: গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
