বিদেশনির্ভর নীতি ও চুক্তির কারণে দেশের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বহুদিন থেকেই বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিগত সরকার আমদানিনির্ভর, বিদেশি ঋণনির্ভর, বিদেশি কোম্পানিমুখী জ্বালানি নির্ভরতা বাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী নামে বিদেশি কোম্পানিরগুলোর লবিস্ট ছিলেন। ফলে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট উত্তরণে তাদের পরামর্শ, বিদেশের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করতে হবে। এ খাতে দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িতদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে বিদেশনির্ভর নীতি ও চুক্তি বাতিল করে নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপের এটিএম শামসুল হক মিলনায়তনে ‘জ্বালানি খাত সংস্কার ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ১৩ দফা দাবি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা। গোলটেবিলের আয়োজন করে ক্যাব। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বকুল। আলোচনায় আরও অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, শ্রমিক অধিকারকর্মী তাসলিমা আখতার, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমসহ রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মীরা।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই মন্তব্য করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এটি বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই বিষয়ে যে চুক্তিগুলো হয়, টেবিলের দুই পাশেই একই পক্ষের লোক থাকে। ওই কোম্পানির দেশি বড় কোম্পানি কিংবা বিদেশি কোম্পানি এবং তাদের লোকজনের মধ্য দিয়ে চুক্তি হয়। এর ফলে একের পর এক বিপুল সম্পদের ব্যয় হয়েছে এবং বাংলাদেশ ক্রমাগত একটা নির্ভরশীলতার মধ্যে আটকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও জাইকার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুতের যে আমদানিমুখী কাঠামো, সেটি একটি মহাপরিকল্পনার অধীন হয়েছে। এটা হঠাৎ কোনো মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা করেননি। এই মহাপরিকল্পনা করেছে জাইকা।
জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার কারণ হিসেবে নীতিকে দায়ী করে আনু মুহাম্মদ বলেন, জ্বালানি সংকট নীতির কারণে হয়েছে। আমদানিনির্ভর, বিদেশি ঋণনির্ভর, বিদেশি কোম্পানিমুখী যেসব চুক্তি বিগত সময়ে হয়েছে এবং তার পেছনে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে এখান থেকে বের হওয়া যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, সবার ধারণা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গণতান্ত্রিক সংস্কার করবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করাতে লবিস্টদের আরও বেশি তৎপরতা দেখা গেছে। কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী ছিলেন যারা নামে উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, কিন্তু কাজে তারা করপোরেট লবিস্ট ছিলেন।
নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করে সেবা খাতে নিয়ে আসতে হবে। জ্বালানি অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হলেই সংকট কাটানো যাবে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি খাত ভুলনীতি দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। আমরা বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে এই আলোচনা কোনো সরকার করেনি। আগের সরকারের কথা (আওয়ামী লীগ) বাদ দিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারও করেনি। এখন ভুলনীতি পরিত্যাগ করে দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞসহ অন্যদের নিয়ে যথাযথ নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তিগুলো কঠিন শর্তের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার অসহায় ছিল উল্লেখ করে সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘আগের সরকারের সই করা চুক্তিগুলোর মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আদানির সঙ্গে সই হওয়া চুক্তিগুলো পড়তে গিয়ে ঘাম ছুটে গেছে। এমন চুক্তি ছিল যে, সত্যিকার অর্থে সরকার খুবই অসহায় ছিল।’
জ্বালানির ন্যায্য বণ্টনের ওপর জোর দিয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি সংকট খাদ্য নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে। তাই এই খাতকে সেবা খাত হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ন্যায্য বণ্ঠন নিশ্চিত করতে হবে। বণ্টনের ক্ষেত্রে বস্তির নারী, শ্রমিক নারী, জেলে ও পোলট্রি শিল্পে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এই জায়গার নারীদের জ্বালানি নিয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বিকল্প উৎস খোঁজার তাগিদ দিয়ে সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি মোকাবিলায় বিরাট ভূমিকা রাখতে পারি। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা নিয়ে আলোচনা হলেও বিষয়টি আর এগোয়নি। আমরা নবায়নযোগ্য এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুতের বিষয়ে আরও মনোযোগী হলে জ্বালানি সংকটে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে ক্যাব যুব সংসদ ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে পুনরায় সেবা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত করা; জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি গড়ে বর্তমান সরকারের ৫ বছর মেয়াদে কমপক্ষে ৫ শতাংশ কমানো নিশ্চিত করা’ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত বৃদ্ধি করে উল্লিখিত ৫ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি; এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রহিত করা এবং কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা; গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানি দ্বারা অনুসন্ধান ও উত্তোলন; আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা এবং আমদানি রদ নিশ্চিত করা; চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করা; জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তিদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার করা; বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত ক্যাবের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা; ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসি আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন; সেই সঙ্গে ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি, ২০২৪ এর আলোকে গণবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা; আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।
