তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার আমাদের দায়বদ্ধতা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১০ এএম

সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, মানুষের অধিকার এবং সমতার ধারণাগুলো প্রসারিত হচ্ছে। পৃথিবীর আলো-বাতাসে সবার সমান অধিকার এ সত্য আমরা সবাই জানি এবং মানি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে আজও এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের জন্য এই স্বাভাবিক অধিকারগুলো রূপকথার গল্পের মতো। বলছি ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কথা। একুশ শতকের এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও, আমাদের সমাজে এই মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, প্রান্তিক এবং মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা ভিনগ্রহের কেউ নন; তারা আমাদেরই সন্তান- ভাই, বোন কিংবা স্বজন। অথচ শুধুমাত্র শারীরিক বা লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে তারা পরিণত হন, সমাজের সবচেয়ে অবাঞ্ছিত মানুষে। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, লিঙ্গপরিচয় কোনো মানুষের স্বেচ্ছাকৃত নির্বাচন নয়; এটি সম্পূর্ণ একটি জন্ম, ক্রোমোজোম বা হরমোনজনিত প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতি যাকে যে রূপ দিয়েছে, সে সেই রূপেই জন্ম নেয়। অথচ এই প্রাকৃতিক ভিন্নতার কারণে, একটি মানুষকে সারা জীবন পদে পদে যে অমানবিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তা কোনো সুস্থ ও বিবেকবান সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

তথ্য ও আইনি কাঠামোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সরকার ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে তারা এই নিজস্ব পরিচয়ে ভোটাধিকার লাভ করে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রেও তাদের জন্য আলাদা লিঙ্গপরিচয়ের ঘর যুক্ত করা হয়। সরকারের তরফ থেকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় নীতি বা আইনের এই স্বীকৃতি কি আমাদের সমাজ জীবনে তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান পুরোপুরি নিশ্চিত করতে  পেরেছে? এর উত্তর অত্যন্ত হতাশার। আজও আমাদের সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের  কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে, পরিবার তাকে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ বা বোঝা মনে করে। সমাজের মানুষের কটূক্তি এবং লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পরিবার এই নিষ্পাপ শিশুদের বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য হয়। যে বয়সে একটি শিশুর কাঁধে বইয়ের ব্যাগ থাকার কথা, বাবা-মায়ের অকৃত্রিম স্নেহে বড় হওয়ার কথা, ঠিক  সেই বয়সে তাদের ঠাঁই হয় গুরুমার ডেরায় সম্পূর্ণ অচেনা এক পরিবেশে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত অভিযোগ রয়েছে যে, এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা রাস্তাঘাট, লোকাল বাস, বাসাবাড়ি ও নবজাতকের জন্মের পর বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে জোরপূর্বক চাঁদা দাবি করে কিংবা অশালীন আচরণ করে। এই অভিযোগ মিথ্যা নয়; তবে এর পেছনের কার্যকারণ নিয়ে আমরা কি কখনো  যৌক্তিকভাবে ভেবেছি? যখন একটি সুস্থ-সবল মানুষকে তার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৃহত্তর সমাজ থেকে ধীরে ধীরে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তখন তার বেঁচে থাকার বিকল্প পথ কী হতে পারে? সমাজে তাদের স্বাভাবিক কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। কেউ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দিতে চায় না। এমনকি মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে কেউ বাসা ভাড়াও দিতে রাজি হয় না। সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকেও, তারা যুগের পর যুগ বঞ্চিত হয়ে আসছে। যখন আমরা রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বেঁচে থাকার সম্মানজনক সব দরজা একে একে বন্ধ করে দিই, তখন তাদের বেঁচে থাকার এই অনাকাক্সিক্ষত এবং অস্বস্তিকর উপায়ের জন্য দিনশেষে আমাদের সমাজব্যবস্থাই কি পুরোপুরি দায়ী নয়? কর্মসংস্থানহীন এবং অধিকারবঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠী পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই এমন পথ বেছে নেয়।

অর্থনৈতিক এবং জাতীয় উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে মূলধারার বাইরে এবং অনুৎপাদনশীল রেখে কখনোই দেশের সামগ্রিক বা টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুযোগ এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারাও যে সমাজের মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, তার চমৎকার সব উদাহরণ আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের অনেকেই মূলধারায় ফিরে এসে সংবাদ পাঠিকা, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি কিংবা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তৈরি পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তারা নিজ নিজ যোগ্যতায় সততার সঙ্গে কাজ করছেন। এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মেধা, শ্রম বা যোগ্যতার দিক থেকে তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই; তাদের ঘাটতি ছিল কেবল একটি সুযোগের, একটু সহমর্মিতার। তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে তা দেশের অর্থনীতিতেই এক বিশাল ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। এই সাংবিধানিক অধিকার তাদেরও প্রাপ্য। কেবল আইন প্রণয়ন করে বা কাগুজে স্বীকৃতি দিয়ে সমাজের গভীরে প্রোথিত এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি আমাদের সস্তা করুণা বা দয়া দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য আইনি ও সামাজিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ  তৈরি করা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ঘটানো এবং সামাজিকভাবে তাদের আপন করে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আসুন, লিঙ্গপরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে আমরা তাদের সর্বপ্রথম ‘মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শিখি। তবেই একটি সত্যিকারের সভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং  বৈষম্যহীন আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব আমরা। তাদের যেন আমরা কোনোভাইে ভিন্ন দৃষ্টিতে না দেখি। একবার ভাবুন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আমি কি দায়ী নই?

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত