রাজধানীর বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনে অগ্নিকা-ে ৪৬ জনের মৃত্যুর জন্য রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। আগুন লাগার পর একটি রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর ব্যবস্থা না করে টাকা আদায়ের জন্য চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনায় করা মামলায় রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ২২ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা।
গত বৃহস্পতিবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক শাহ জালাল মুন্সী ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আলোচিত এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। ১১ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। আর জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে। ঘটনার পরদিন ১ মার্চ রমনা থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। মামলায় অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ, ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা এবং এর ফলে প্রাণহানি ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগপত্রে আসামিরা হলেনÑ চুমুক কফিশপের স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক, কাচ্চি ভাই, খানাজ এবং তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী সোহেল সিরাজ, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জেইন উদ্দিন জিসান, জেস্টি রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ষষ্ঠ তলার ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম খান, মেজবানিখানা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, অ্যামব্রোশিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজাইন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ, সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ প্রমুখ।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও মৃত্যুবরণ করায় ভবনের মালিক এ কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া এই মামলায় আনোয়ার হোসেন সুমন এবং শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ জন্য তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভবনের নিচতলার ‘চুমুক’ কফিশপের বৈদ্যুতিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ৫ তলা অনুমোদিত ভবনে অবৈধভাবে ৮ তলা পর্যন্ত কার্যক্রম চলছিল, কোনো উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা জরুরি বহির্গমন পথও ছিল না। ভবনের ১০টি রেস্টুরেন্টেরই বৈধ কাগজপত্র ছিল না। ভবনের সিঁড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার রেখে পথ আটকে রাখা হয়েছিল।
আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ‘কাচ্চি ভাই’ খাবারের দোকানের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে খাবারের বিল পরিশোধ না করে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারেন। আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন তলায় থাকা কিছু মানুষ ছুটে যান ছাদের দিকে। কিন্তু ভবনের আটতলা ও ছাদ মিলে অবৈধভাবে ‘ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্ট’ থাকায় সেখানে গিয়েও আশ্রয় নিতে পারেননি তারা। ওই ঘটনায় তিনজন ছাড়া বাকিরা ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান
গণমাধ্যমকে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হবে।