যুদ্ধের আঁচড়মুক্ত চট্টগ্রাম বন্দর!

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে অস্থিরতার ঢেউয়ের আঁচড় এখনো লাগেনি চট্টগ্রাম বন্দরে। অন্ততপক্ষে যুদ্ধের এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবাহিত পণ্যের উপাত্তে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি উভয় এককেই ফেব্রুয়ারির চেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। শুধু পণ্যই নয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ৪৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজের মধ্যে ৩৭টি খালাস করে চলে গেছে এবং বাকি জাহাজগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘এমটি ইউয়ান জিং হো’ গতকাল শুক্রবার ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে ডলফিন জেটিতে ভিড়েছে। আরও একটি জাহাজ আজ ভেড়ার কথা রয়েছে এবং বাকি চারটি জাহাজ পাইপলাইনে রয়েছে।

মার্চ মাসজুড়েই চলল ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়ংকর যুদ্ধ। এখনো যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে এই যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য আনা-নেওয়ায় কোনো সমস্যা হবে না বলে শিপিং সংশ্লিষ্টদের ধারণা। আর এই ধারণার প্রমাণ পাওয়া যায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত এক মাসের উপাত্তে। গত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৮ একক কনটেইনার আমদানি ও ১ লাখ ১৮ হাজার ২৩২ একক কনটেইনার রপ্তানি হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার ৯৮০ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৭২৭ (আমদানি ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৯২ ও রপ্তানি ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫) একক কনটেইনার। চট্টগ্রাম বন্দরের উপাত্তে খালি কনটেইনারের সংখ্যাও যুক্ত থাকে বলে পণ্যভর্তি কনটেইনারের সংখ্যা জানতে ২১টি অফডকের উপাত্ত যাচাই করা হয়। সেই উপাত্তে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে পণ্যভর্তি ৮৩ হাজার ৬৭৪ একক কনটেইনার (রপ্তানি ৫৮ হাজার ৮২৯ ও আমদানি ২৪ হাজার ৮৪৫) হ্যান্ডলিং হলেও গত মাসে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৮৭ একক কনটেইনার। এর মধ্যে রপ্তানি পণ্য ছিল ৫৭ হাজার ৫২৮ একক কনটেইনার ও আমদানি পণ্য ছিল ৩৫ হাজার ২৫৯ একক কনটেইনার। এ বিষয়ে ২১টি অফডকের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা পণ্যভর্তি কনটেইনারের হিসাব রাখি। ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে আমাদের বেশি হ্যান্ডলিং হয়েছে। তবে রপ্তানি পণ্য কিছুটা কমলেও আমদানি পণ্য বেড়েছে। আমদানিকৃত ৬৫টি আইটেমের পণ্য আমাদের অফডক হয়ে খালাসের বিধান চালু রয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সব পণ্য আনা-নেওয়া হয়ে থাকে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবাহিত পণ্যের উপাত্তে এখনো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দেখা যায়নি। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনছে, তারপরও অন্ততপক্ষে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কিন্তু স্বাভাবিক রয়েছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় এবার ২৫ হাজার একক কনটেইনার বেশি হ্যান্ডলিং হয়েছে। শুধু মার্চ মাস নয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের সঙ্গে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের উপাত্ত তুলনা করলেও দেখা যায়, কার্গোতে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং কনটেইনারে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে কেন প্রভাব পড়েনি এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় শিপিং সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ও ক্রাউন নেভিগেশন প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদ ছরওয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বন্ধ হয়েছে হরমুজ প্রণালি (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের যুক্ত চ্যানেল)। কিন্তু এই প্রণালি ব্যবহার করে আমাদের আমদানি ও রপ্তানিবাহী কোনো পণ্য আসা-যাওয়া করে না।

ইউরোপগামী পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর যায় এবং সেখান থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ভূ-মধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে এবং আমেরিকার পণ্যগুলো সিঙ্গাপুর থেকে জাপান হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলোতে আনা-নেওয়া হয়ে থাকে বলে সাহেদ ছরওয়ার জানান।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরিধি বাড়লে সুয়েজ খাল বন্ধ করে দেওয়া হলে কিন্তু ইউরোপের পণ্যগুলো আনা-নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানান বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ। তিনি বলেন, সুয়েজ খাল বন্ধ হলে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ইউরোপের বন্দরগুলোতে পণ্য পৌঁছাতে আরও বাড়তি ১৫ থেকে ১৮ দিন লাগলেও পণ্যের পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে না।

তাই বলে কি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের শিপিং বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না এমন প্রশ্নের জবাবে শিপিং সেক্টরের প্রতিনিধিরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানি আসতে না পারলে শিল্পকারখানাগুলো সচল থাকবে না, শিল্পকারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য যেমন জাহাজীকরণ করা যাবে না, তেমনিভাবে জাহাজ থেকেও আমদানি পণ্য কারখানায় নেওয়া যাবে না। মোদ্দাকথা সারা দেশে অচলাবস্থা তৈরি হবে। এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্যই সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও মার্চ মাসেই কাতার, আরব আমিরাত, ওমানের পাশাপাশি বিকল্প দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালেয়শিয়া, অস্ট্রেলিয়া এমনকি ভারত এবং আমেরিকা থেকে ৪৩টি জাহাজবোঝাই এলপিজি-এলএনজি-তেল সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। গতকালও এসেছে একটি জাহাজ এবং আজ আরও একটি জাহাজ ভেড়ার কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত