জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) মামলায় সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী ডা. জোবাঈদা শাহনূর রশীদকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। রবিবার (৫এপ্রিল) দুপুরে আসামিরা পাবনা বিশেষ (জেলা জজ) আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক আবু সালেহ্ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খাঁ আবেদনটি নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
দুদকের আইনজীবী মনোয় কুমার দাস এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, ২০২৩ সালের ৬ জুলাই দুদক পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সাবেক উপ-পরিচালক খায়রুল হক বাদী হয়ে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী ডা. জোবাঈদা শাহনূর রশীদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। এরপর ২০২৪ সালের ১০ জুলাই স্ত্রী জোবাঈদা শাহনূর রশীদ ও চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি আবু হেনা মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেয় দুদক।
তিনি আরও জানান, এ মামলা দায়েরের পর আসামিরা উচ্চ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে আদালত দু’জনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেন। এরপর তারা পাবনা স্পেশাল জেলা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন জানান এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার অজুহাত দেখিয়ে শুনানির জন্য আদালতের কাছে সময় চান। এভাবে কয়েক দফা তারিখ নিয়ে শুনানিতে কালক্ষেপণের পর আজ আদালতে এসে জামিন প্রার্থনা করেন। পরে শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০২২ সালের ২৩ জুন আসামি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. জোবাইদা শাহনূর রশীদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করে দুদক। এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৬ আগস্ট পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। যেখানে তিনি স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ২ কোটি ২১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯২ টাকার সম্পদের হিসাব জমা দেন। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে মোট ৩ কোটি ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৭৩ টাকার সম্পদের তথ্য প্রমাণ মেলে। অর্থাৎ এখানে তিনি ৯১ লাখ ১৩ হাজার ৮১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বা মিথ্যা তথ্য দাখিলের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রীকে দানসহ পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় হিসাব করলে দুদকের অনুসন্ধানে মোট ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭৬০ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে গ্রহণযোগ্য আয় ১ কোটি ৫০ লাখ ৯২ হাজার ২৬৭ টাকা। যা বাদ দিলে ৬ কোটি ৩৫ লাখ ৪ হাজার ৪৯৩ টাকার সম্পদের উৎস দেখাতে পারেননি তিনি। ফলে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে দুদকের কাছে প্রমাণিত হয়।
একইসঙ্গে অবৈধ ওই সম্পদের মধ্যে আসামি আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার মায়ের দানকৃত ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা তার আয়কর নথির ২০০১-২০০২ করবর্ষ হতে ২০০৬-২০০৭ করবর্ষ পর্যন্ত প্রদর্শন করেছেন। এ টাকা থেকে তিনি তার স্ত্রী ডা.জোবাঈদা শাহনূর রশীদকে বিভিন্ন সময়ে ২ কোট ৭০ লাখ টাকা দান করেছেন। যা তাদের উভয়ের আয়কর নথিতে এ দান গ্রহণ ও প্রদানের বিষয়টি প্রদর্শিত রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান বা যাচাইকালে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, আসামি আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয়কে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে বৈধতা দানের জন্য অসৎ উদ্দেশ্যে প্রথমে তার মায়ের আয়কর নথিতে প্রদর্শন করেন এবং পরবর্তীতে তা দান হিসেবে নিজের আয়কর নথিতে প্রদর্শন করেছেন। পরবর্তীতে দানকৃত এ টাকার মধ্য থেকে তার স্ত্রী ডা. জোবাঈদা শাহনূর রশীদকে দান করেন এবং স্ত্রীর নামে সম্পদ অর্জন করেন। যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যদিকে স্ত্রী ডা. জোবাইদা শাহনূর রশীদ দুদকে দাখিলকৃত তার সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ২ কোটি ৪০ লাখ ১৭ হাজার ৭৩১ টাকার পরিসম্পদের তথ্য দাখিল করেন। অনুসন্ধান বা যাচাইকালে তার নামে মোট ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬২ হাজার ৩১ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ তিনি ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩০০ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানকালে আরও দেখা যায়, আসামি ডা. জোবাঈদা শাহনূর রশীদের নীট সম্পদ, পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়সহ ৪ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার ৫০৯ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে তার গ্রহণযোগ্য আয় ১ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৫৭ টাকা বাদ দিলে ২ কোটি ৭৩ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫২টাকার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা তার স্বামী আবু হেনা মোস্তফা কামাল থেকে দান সূত্রে প্রাপ্ত। তাদের উভয়ের আয়কর নথিতে উক্ত দান গ্রহণ ও প্রদানের বিষয়টি প্রদর্শিত রয়েছে।
যার মাধ্যমে দুদকের কাছে প্রমাণিত হয়েছে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ আয়কে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে বৈধতা দানের চেষ্টা করেছেন। যেখানে স্ত্রী হিসেবে তিনি তার স্বামীকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন। যে কারণে এই মামলায় ডা. জোবাঈদা শাহনূর রশীদকে প্রথম ও স্বামী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। উভয় মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা দুটি দায়ের করা হয়।
