ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে দেশটিতে ফের বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের সক্ষমতা ধ্বংস করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
টানা দশম রাতের মতো চলা এই হামলা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সম্প্রতি তিন মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় ইরানকে ‘উপযুক্ত শিক্ষা’ দেবে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প এর আগে এক বিবৃতিতে বলেন, জর্ডানে দুই এবং ইরাকে এক মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনার ‘সম্মানে’ গত রাতে ইরানে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ আঘাত হানা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা আইআরএনএ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালীতে দুটি তেল ট্যাংকার এবং বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল হওয়া সত্ত্বেও তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তৃতীয় কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে এখনো কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, নৌ সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেন্টকম দাবি করেছে, এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ অতিক্রম করার সময় আক্রান্ত হওয়া দুটি তেল ট্যাংকার থেকে কর্মীদের উদ্ধারে কাজ করছে তাদের উদ্ধারকারী দল।
এদিকে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য বিষয়ক সংস্থা ‘ইউকেএমটিও’ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত এক বস্তুর আঘাতে একটি তেল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে জাহাজের ক্রু সদস্যরা জীবন রক্ষাকারী নৌকায় করে জাহাজ ছাড়তে বাধ্য হন। তবে সংস্থাটির উল্লিখিত ট্যাংকারটি ইরানের দাবি করা দুই ট্যাংকারের একটি কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত উইকএন্ডে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় প্রাণ হারানো তিন মার্কিন সেনার মধ্যে দুজনের পরিচয় মঙ্গলবার রাতে নিশ্চিত করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। নিহতরা হলেন- টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গঞ্জালেস এবং হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান। সেন্টকম আগেই জানিয়েছিল, ওই হামলার পর এক সেনা নিখোঁজ হন এবং পরে দুর্ঘটনাস্থল থেকে অজ্ঞাত পরিচয় দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানেও যুদ্ধাবস্থা ছড়িয়ে পড়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী সোমবার গভীর রাতে জানায়, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তারা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। এর আগে পুরো জর্ডান জুড়ে সতর্কসংকেত বাজানো হয়।
একই দিনে কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীও জানায়, তারা তাদের আকাশসীমায় ইরানের বেশ কয়েকটি ড্রোন প্রতিরোধ করেছে। অন্যদিকে বাহরাইন দাবি করেছে, ইরানের ড্রোন তাদের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নিশানা করেছিল, তবে সেখানে বিমান চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
মার্কিন হামলা প্রসঙ্গে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির তাবরিজ, চাবাহার, কোনারক, বন্দর মাহশার এবং বন্দর ইমাম খোমেনিসহ বেশ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার সময় দুটি তেল ট্যাংকারে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ দক্ষিণ রুট’ ব্যবহার করায় ট্যাংকার দুটিতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। তবে সেন্টকম ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূত্র: বিবিসি