উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত ষষ্ঠ সপ্তাহে গড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহেই হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন দাবি করেছে, দীর্ঘ এই সংঘাতে ইরানের ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং তাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছে। তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে মাশুলও গুনতে হচ্ছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র খরচ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ইরানে হামলায় দূরপাল্লার ‘ক্ষেপণাস্ত্রের সিংহভাগই বরাদ্দ দিয়েছে’ যুক্তরাষ্ট্র। সমর বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে একদিকে যেমন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডসহ অন্যান্য অঞ্চলের জন্য রাখা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদেও টান পড়বে। তাদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পরবর্তী পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের দূরপাল্লার জেএএসএসএম-ইআর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের সিংহভাগ নিশ্চিতভাবেই খালি করে ফেলবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য মজুদ রাখা ১৫ লাখ ডলার মূল্যের অস্ত্রশস্ত্র বের করতে মার্চের শেষেই আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে বিষয়টি সম্বন্ধে সরাসরি জ্ঞাত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডসহ অন্যান্য অঞ্চলের স্থাপনাগুলোতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রও সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বিভিন্ন ঘাঁটি কিংবা যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ডের ঘাঁটিতে পাঠানো হবে বলেছেন নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সংবেদনশীল এ বিষয় নিয়ে আলোচনায় রাজি হওয়া ওই ব্যক্তি। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে আর কেবল ৪২৫টির মতো জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল-এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ বা জেএএসএসএম-ইআর বাকি দুনিয়ার জন্য থাকবে। যুদ্ধের আগে ভাণ্ডারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ২ হাজার ৩০০টি। ভাণ্ডারে থাকা ওই ৪২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ১৭টি বি-ওয়ানবি বোমারু বিমান একসঙ্গে বড়জোর কেবল একটি মিশনই চালাতে পারবে। এর বাইরে নষ্ট ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকা আরও ৭৫টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্যবহার অনুপযোগী’ অবস্থায় আছে। জেএএসএসএম-ইআর চাইলে ৬০০ মাইলের (৯৬৬ কিলোমিটার) বেশি উড়ে যেতে পারবে; শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা এড়াতে নিরাপদ দূরত্ব থেকে নিশানা লক্ষ্য করে ছোড়া যাবে এ নকশাতেই এগুলো বানানো হয়েছে। আড়াইশ’ মাইলের মতো উড়ে যেতে সক্ষম স্বল্পপাল্লার জেএএসএসএমের পাশাপাশি জেএএসএসএম-ইআরের মজুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ইরান যুদ্ধে বরাদ্দ হয়েছে বলেছেন ওই ব্যক্তি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশপথে ইরানে অভিযান শুরুর পর থেকেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী অস্ত্রের সরবরাহ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা পূরণ করতে বর্তমান উৎপাদন হারে অনেক বছর লেগে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ধরে জেএএসএসএম-ইআরের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এসেছে; এতে সেনা সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি এড়ানো গেলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জন্য রাখা অস্ত্রের মজুদে টান পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস করে দিয়েছে। যার কারণে তারা এখন দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তুলনামূলক সস্তা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতে পারছে। কিন্তু শুক্রবারই ইরান একাটি মার্কিন এফ-১৫ই গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তার কিছুক্ষণ পর একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানও ভূপাতিত হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাতে সক্ষম দুটি হেলিকপ্টারও ইরানিদের ছোড়া গুলিতে কাবু হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা ওই ব্যক্তি বলেছেন, ইরানে প্রথম চার সপ্তাহের যুদ্ধই ১ হাজারের বেশি জেএএসএসএম-ইআর ‘গিলে খেয়েছে’। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমানগুলো এমন ৪৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল বলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ২০০৯ সালের পর এ পর্যন্ত ৬ হাজার ২০০-র বেশি জেএএসএসএম কেনার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জেএএসএসএমের সাধারণ সংস্করণের উৎপাদনও প্রায় ১০ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। এগুলোর দূরপাল্লার সংস্করণের ৩৯৬টি- ২০২৬ সালে বানানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে লকহিড মার্টিন করপোরেশনের। তবে তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা রয়েছে বছরে ৮৬০টি জেএএসএসএম বানানোর। লকহিড মার্টিন জাহাজ-বিধ্বংসী এলআরএএসএম ক্ষেপণাস্ত্রও বানায়। তবে কেবল জেএএসএসএম বানাতে মনোনিবেশ করলে তাদেরকে দূরপাল্লার জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এলআরএএসএম বানানো বন্ধ রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্লুমবার্গ যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইরান অভিযানে পরবর্তীতে কী করতে যাচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মেরিন, প্যারাট্রুপারসহ কয়েক হাজার স্থলসেনা ওই অঞ্চলে পাঠানোর পর ওয়াশিংটন শিগগিরই খার্গ দ্বীপ দখল করতে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এই খার্গ দ্বীপেই ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। বুধবার রাতে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেবেন, যেখানে থাকার যোগ্য তারা’।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফস জেনারেল ড্যান কেইন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ওপর দিয়ে বি-৫২ বিমান ওড়ানো শুরু করেছে, যার অর্থ ছিল ইরানের আকাশসীমা এখন তুলনামূলক সস্তা ও বিপুল পরিমাণ জেডিএএম (জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনেশন) ব্যবহারের জন্য নিরাপদ। কিন্তু শুক্রবার দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইরান প্যাঁচ লাগিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত তেহরান ১২টির বেশি এমকিউ-৯ আক্রমণকারী ড্রোনও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া সরকারি হিসাব বলছে, ইরান এখন পর্যন্ত পুরো অঞ্চলজুড়ে ১ হাজার ৬০০-র বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সঙ্গে ছুড়েছে শাহেদ ধরনের ৪ হাজারের মতো সস্তা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। তাদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় এরই মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ২০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী গোলা বা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়েছে। লকহিড মার্টিন প্রতি বছর সাড়ে ৬শ’র মতো প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর বানায়। তবে জানুয়ারিতে তারা উৎপাদন বাড়ানোর একটি চুক্তি করেছে, যার ফলে ২০৩০ সালে তারা ২ হাজারের মতো ইন্টারসেপ্টর বানাতে সক্ষম হবে। এ কোম্পানিটি বছরে ৯৬টি থার্ড ইন্টারসেপ্টরও বানায়, এই সংখ্যা ৪০০তে উন্নীত করতেও পৃথক এক চুক্তিতে পৌঁছেছে তারা। ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে কয়েকশ’ টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে। যুদ্ধের আগে পুরনো মডেল ও জাহাজ বিধ্বংসী সংস্করণ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে হাজার চারেকের মতো টমাহক ছিল। আরটিএক্স করপোরেশন ২০২৫ সালে ১০০র মতো নতুন টমাহক বানিয়েছে; পাশাপাশি ২৪০টির মতো পুরনো মডেলকে অত্যাধুনিক ব্লক ফাইভ মাত্রার সংস্করণে উন্নীত করেছে।
