নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ আমলে ‘এমপি প্রকল্প’ নামে পরিচিত ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্প। এ প্রকল্পের ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। গতকাল সোমবার একনেক সভায় এ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পসহ অনুমোদন পাওয়া ৫ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা; সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন রয়েছে ৩৯০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ রয়েছে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে এই একনেক সভায় সভাপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভার কার্যসূচিতে থাকা ১৯টির মধ্যে ৭টি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা সম্ভব হয়েছে। একনেক সভা শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এজেন্ডায় থাকা ১৯টি প্রকল্পের বেশিরভাগই আগের সরকারের নেওয়া। পর্যালোচনায় নানা সমস্যা ও অপ্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন উঠে আসায় মাত্র ৭টি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে ৫টি অনুমোদন পেয়েছে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদন পাওয়া সংশোধিত প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। নতুন সরকারের একনেক সভার জন্য প্রস্তুত করা প্রাথমিক কার্যসূচি থেকে জানা গেছে, এ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির এলাকাভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি ৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়, আর সবচেয়ে কম মেহেরপুরে দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকার এমপিদের নিজ এলাকার ধর্মীয় স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। প্রকল্পের আওতায় সর্বজনীন অবকাঠামো যেমন কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা এবং ঈদগাহ ইত্যাদির অবকাঠামোগত উন্নয়ন-সংস্কার-মেরামত-প্রাচীর নির্মাণ প্রভৃতি ছিল। শুরু থেকেই এমপিদের অপব্যবহারের কারণে নানা বিতর্কের জন্ম দেয় এই প্রকল্প। তখন থেকেই এটি ‘এমপি প্রকল্প’ নামেই পরিচিতি পায়।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মাধ্যমে এমপিরা নিজেদের মতো করে মসজিদ, মন্দির এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নেতাদের নিজস্ব কবরস্থানের উন্নয়নও করেছিলেন। অনেক জায়গায় কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রকল্পের আগের বকেয়াগুলোও গত অর্থবছরে আগাম দিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু বিএনপি সরকারের প্রথম একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য সমাপ্ত হতে যাওয়া এই প্রকল্পে নতুন করে ব্যয় ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এলজিইডি বলছে, চলমান প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি এলজিইডির ২০২০-২১ অর্থবছরের দর তালিকা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল। এরপর নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর ও শ্রমিকের মজুরি বহু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য ২০২২ সালের জুনে এলজিইডির বিভাগীয় দর তালিকা একবার সংশোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেটি আরও হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে বছরভিত্তিক প্রকৃত খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা ভাতা ঘোষণার কারণে নতুন ইকোনমিক সাবকোড অন্তর্ভুক্ত করাও সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ১ম সংশোধনী প্রস্তাবে এই বিতর্কিত ব্যয় ও পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। আইন অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি যেকোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। আইএমইডির তথ্যমতে, এই প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। আইএমইডির এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু কাজের প্রাক্কলন সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। আইএমইডি তাদের সুপারিশে উল্লেখ করেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিরোধ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমজাতীয় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এই বিতর্ক এবং প্রকল্পের নানা জটিলতা নিয়েই নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভায় এ প্রকল্প আবারও অনুমোদন পেয়েছে।
প্রকল্প পর্যালোচনায় কমিটি গঠন, প্রধান তিতুমীর : এদিকে জনগণের টাকার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কভাবে প্রকল্প বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একনেক সভা শেষ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধিকাংশ প্রকল্পই অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাই চলমান পুরনো প্রকল্পগুলো শেষ করে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিগগির নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে। চলমান প্রকল্প পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিশ্লেষণের পর অনেক প্রকল্প বাদ যাবে। বিগত দিনের প্রকল্পগুলোর ‘ক্লিনিং প্রসেস’ শেষ করে আগামী দিনে নতুন প্রকল্প আনা হবে। তিনি বলেন, দলের নির্বাচনী ইশতেহার ধারণ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যেন পূরণ করা যায়, সেভাবে এগোচ্ছে সরকার। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বিবেচনা করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, আগের সরকারের সময়ে নেওয়া ১ হাজার ৩০০- এর মতো উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর অনিয়ম ও যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কমিটি করা হয়েছে।
অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলোর বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘সভায় অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে সংশোধিত ছিল ৩টি ও মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২টি প্রকল্পের। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ২টি; (ক) সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ (১ম সংশোধন) প্রকল্প। (খ) চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট-৪ (সিডিএসপি-৪) (৩য় সংশোধন) প্রকল্প। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রয়েছে ২টি; (ক) শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন (কম্পোনেন্ট-২) : দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্প। (খ) গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন (২য় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্প। এ ছাড়া রয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প।
