চাঁদের কাছাকাছি ঐতিহাসিক উড্ডয়ন শেষে পৃথিবীর পথে আর্টেমিস-টু মিশনের ৪ নভোচারী। দীর্ঘ ৫৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তারা। পৃথিবী থেকে রেকর্ড ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে, চাঁদের রহস্যময় অন্ধকার অংশ ঘুরে এসেছেন এই নভোচারীরা। এই যাত্রায় চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা অন্ধকার অংশ প্রদক্ষিণ করার সময় সেই দৃশ্য দেখেছেন, যা আগে কখনো কোনো মানুষ দেখেনি। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে ৪ লাখ ১৭১ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছেছিল অ্যাপোলো ১৩ মিশন। গত সোমবার গ্রিনিচ মান সময় বেলা ৩টা ৫৮ মিনিটে এই দূরত্ব অতিক্রম করেন আর্টেমিস-টু মিশনের নভোচারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে- উড্ডয়নপর্ব সফলভাবে শেষ হওয়ার পর, ওরিয়ন মহাকাশযান এখন পৃথিবীর পথে রয়েছে। চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসতে মিশনের ওরিয়ন ক্যাপসুলের সময় লেগেছে ৭ ঘণ্টার মতো। এ সময় চাঁদের দূরবর্তী অংশের ছবিও ধারণ করা হয়েছে। এই মিশনে অংশ নিয়েছেন রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ। তাদের সঙ্গে ছিলেন কানাডার মহাকাশ সংস্থার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন।
নভোচারীদের ক্যাপসুল চাঁদের উল্টো পাশে গেলে পৃথিবী ও মহাকাশযানের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় চাঁদ। এ সময় রেডিও সিগন্যাল যাতায়াত করতে না পারায় প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবী থেকে নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। সেই সময়ই নভোচারীরা আর্থরাইজ বা চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর উদয়ের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। পাশাপাশি চাঁদের যে অংশ পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না, সেই দূরবর্তী পৃষ্ঠের বেশ কিছু ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেন। মিশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ছিল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা। ওরিয়ন মহাকাশযানের অবস্থান থেকে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী এক সরলরেখায় অবস্থানের বিরল দৃশ্য উপভোগ করেন নভোচারীরা। মহাকাশ গবেষকদের মতে, এ ধরনের অবস্থান ভবিষ্যৎ গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্য মূল্যবান পর্যবেক্ষণের তথ্য দেবে। আগামী শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৭ মিনিটে পশ্চিম উপকূলের অদূরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবেন মহাকাশচারীরা।
মিশন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেন, তারা যা দেখছেন তা বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন। তিনি বলেন, ‘আমরা আজ যা দেখেছি, মানুষ সম্ভবত এমন দৃশ্য দেখার জন্য এখনো বিবর্তিত হয়নি।’ মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানান, এ অভিজ্ঞতা বর্ণনাতীত। যতক্ষণই আমরা তাকিয়ে থাকি না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক ওই দৃশ্য পুরোপুরি তৈরি করতে পারছে না। এটা অসাধারণ, পরাবাস্তব এটা বোঝাতে কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়। আমাকে নতুন শব্দ বানাতে হবে, জানালার বাইরে আমরা যা দেখছি, তা বোঝানোর মতো শব্দ নেই। চাঁদের দূরতম অংশ পর্যবেক্ষণের পর্ব শেষ হওয়ার পর মিশনের লাইভ সম্প্রচারে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আর্টেমিস-টুর নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা যা করছেন, এর মতো কিছু মানুষ আগে কখনো দেখেনি। এটা সত্যিই অতুলনীয়।’ গত সপ্তাহে ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণের পর থেকে আর্টেমিস-টু নভোচারীরা নিজেদের ওরিয়ন ক্যাপসুলে অবস্থান করছেন। বহু বিলিয়ন ডলারের এ সিরিজ মিশনের লক্ষ্য চীনকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে নভোচারীদের পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া এবং আগামী দশকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এছাড়া চাঁদে একটি ঘাঁটি তৈরি করতে চায় নাসা, যা ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে সম্ভাব্য মিশনের প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে কাজ করবে।
