খাদ থেকে তুলতে গুচ্ছ পরিকল্পনা

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম

আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দফায় দফায় উড়োজাহাজের জ¦ালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে প্রায় খাদে  পড়েছে দেশের সবকটি এয়ারলাইনস কোম্পানি। যাত্রীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের কারণে রুটের সংখ্যাও কমেছে। সবদিক দিয়েই টালমাটাল অবস্থা এই শিল্প খাতের। এই অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্পকে খাদ থেকে টেনে তুলতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছেন এয়ারলাইনস মালিকরা। এরই অংশ হিসেবে গতকাল রাজস্ব ভবনে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন তারা। বৈঠকে ভ্যাট কমানোর পাশাপাশি টিকিট মূল্য কমানোর ইঙ্গিত মিলেছে দুইপক্ষ থেকেই।

অ্যাভিয়েশন-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের অ্যাভিয়েশন খাত, বিশেষ করে হেলিকপ্টার শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান করের চাপ, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এবং নীতিগত জটিলতার কারণে এই শিল্প প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে একগুচ্ছ বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে ‘অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’। সংগঠনটির সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান করনীতি ও শুল্ক কাঠামো অব্যাহত থাকলে দেশের হেলিকপ্টার ও এয়ারলাইনস শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং যারা টিকে আছে তারা ভর্তুকি ও লোকসানের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে জেট ফুয়েলের ওপর আরোপিত শুল্ক ও কর। বর্তমানে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের সিআইএফ মূল্য ১৪৯ টাকা ৫৬ পয়সা হলে তার ওপর প্রায় ৪১ টাকা ২৮ পয়সা কর আরোপিত হয়, যা মোট মূল্যের প্রায় ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর সঙ্গে বিপিসির অপারেশনাল খরচ হিসেবে আরও ১১ দশমিক ৪৫ টাকা যোগ হয়। ফলে জ¦ালানি ব্যয় অত্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি টিকিটের দামে প্রভাব ফেলছে।

অ্যাভিয়েশন অপারেটররা প্রস্তাব করেছেন, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের ওপর আমদানি শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে করের হার সমন্বয়েরও দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, অধিকাংশ দেশেই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে জ্বালানির দামে এত পার্থক্য নেই। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও জ্বালানির ওপর কর কমিয়ে আনা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে উল্টো করের পরিমাণ বেড়েছে। শুধু জ্বালানিই নয়, উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ আমদানিতেও রয়েছে উচ্চ শুল্ক। বর্তমানে এসব যন্ত্রাংশের ওপর আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই খাতে আরোপিত শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা না হলে অপারেটরদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এইচএস কোডের আওতায় টার্বো-জেট ও টার্বো-প্রোপেলার ইঞ্জিনের ওপর শুল্ক ও কর আরোপ করা হচ্ছে। অথচ এসব যন্ত্রাংশ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অতিরিক্ত কর আরোপ শিল্পকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এ কারণে এই খাতে শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

একটি এয়ারলাইনস কোম্পানির কর্ণধার দেশ রূপান্তরকে জানান, অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম গতকাল লিটারপ্রতি বেড়েছে ২২৭  টাকা ৮ পয়সা। জ¦ালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কেবল এয়ারলাইনসগুলোই সংকটে পড়েনি, বরং পর্যটন শিল্প এবং নিয়মিত আকাশপথের যাত্রীরাও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে। এতে লিটারপ্রতি দাম বাড়ে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা। আন্তর্র্জাতিক রুটে প্রতি লিটার ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ টাকার বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে ৮ মার্চ অভ্যন্তরীণ রুটে দাম ৯৫ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ০.৬২ ডলার থেকে ০.৭৩৮৪ ডলার করা হয়েছিল।

বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। তেলের দাম না কমলেও ভ্যাট কমানোর আশ্বাস মিলেছে। আমরাও বলেছি টিকিটের দাম কমানো হবে। এরই মধ্যে আজ (গতকাল) আবারও তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়েছি। তারপরও আমরা বেশকিছু পরিকল্পনা নিয়েছি কীভাবে এই শিল্পকে খাদ থেকে ওঠানো যায়।  

এনবিআরের বৈঠকে আরও বলা হয়েছে, উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস আমদানিতে বর্তমানে কোনো বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা নেই। ফলে আমদানি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয় এবং খরচও বেড়ে যায়। যদি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা চালু করা হয়, তাহলে দ্রুত শুল্কায়ন সম্ভব হবে, ব্যয় কমবে এবং এর সুফল যাত্রীরাও পাবেন। মানবসম্পদ উন্নয়নেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় প্রশিক্ষণের ওপর ১০ শতাংশ এবং বিদেশি প্রশিক্ষণের ওপর ২০ শতাংশ আয়কর আরোপ করা হয়, পাশাপাশি ১৫ শতাংশ মূসকও প্রযোজ্য। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না, যা সরাসরি নিরাপত্তা ও সেবার মানের ওপর প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় প্রশিক্ষণ ব্যয়ের ওপর থেকে কর ও মূসক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রীদের ওপর আরোপিত বিভিন্ন চার্জ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীপ্রতি মোট কর ও ফি প্রায় ১ হাজার ১২৫ টাকা, যা মোট ভাড়ার প্রায় ৪২ শতাংশ। অ্যাভিয়েশন অপারেটররা এই হার কমিয়ে ৭২৫ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, উচ্চ করের কারণে টিকিটের দাম বেড়ে যায় এবং যাত্রীসংখ্যা কমে, ফলে সরকারের রাজস্বও কমে। আয়কর আইনের ধারা ১৬৩ নিয়েও গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। এই ধারার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে থাকলেও তাদের ওপর ন্যূনতম কর আরোপ করা হয়, যা কর ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে উৎসে কাটা কর ফেরত পাওয়া যায় না, ফলে প্রতিষ্ঠানের মূলধন সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাই এই ধারা সংশোধন বা বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে। একইভাবে আয়কর আইনের ধারা ২২৬ অনুযায়ী কর ফেরত দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। করদাতারা কর ফেরত পেতে গিয়ে নানা জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই দ্রুত ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্বনির্ধারিত পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও শিথিল করার   প্রস্তাব এসেছে।  হেলিকপ্টার আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধিও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মোট করহার ছিল ১০ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে করে নতুন হেলিকপ্টার আমদানিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তাই পূর্বের করহার পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়েছে। চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার সেবার ক্ষেত্রেও উচ্চ করের কারণে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে এই সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক এবং ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে কোনো সেবার ভাড়া ১ লাখ টাকা হলে করসহ তা প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এতে গ্রাহকরা এই সেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এ ছাড়া চার্টার্ড সেবার বিলের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তন করা হয়, যা ফেরত পাওয়া কঠিন। ফলে অপারেটরদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রুটে জেট ফুয়েলের নতুন নির্ধারিত মূল্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কলকাতায় প্রতি লিটার ০.৬২ ডলার, মাস্কাটে ০.৬০৩ ডলার, দুবাইয়ে ০.৫৮৭ ডলার, জেদ্দায় ০.৫৮১ ডলার এবং দোহায় ০.৫৮৪ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে ব্যাংককে ১.০৯৮ ডলার, সিঙ্গাপুরে ০.৫৮৬ ডলার মূল্যে জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলোকে, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। একটি এয়ারলাইনসের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। জেট ফুয়েলের হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অপারেশনাল খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমানো বা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, কার্গো খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক বেশি। দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে এবং প্রায় আগের দামে জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই মূল্যবৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের অ্যাভিয়েশন খাতে নতুন এক চাপের বাস্তবতা তৈরি করেছে। জ্বালানি ব্যয় যেহেতু একটি এয়ারলাইনসের পরিচালন খরচের বড় অংশ, তাই এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি পুরো শিল্পকে অস্থির করে তুলবে। খরচ ব্যবস্থাপনা এখন এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত