আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের লালবাগ জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন তাকে আদালতে হাজির করে দুই দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা রিমান্ড ও জামিনের উভয় আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত সোমবার দেড়টার দিকে শিরীন শারমিনকে ধানম-ি থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্পিকার পদ ত্যাগ করেন শিরীন শারমিন। এরপর তিনি কোথায় ছিলেন, আত্মগোপনে ছিলেন কি না, এ নিয়ে প্রায় ২০ মাস ধোঁয়াশা ছিল।
গতকাল দুপুর ২টার দিকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কিছুক্ষণ ঢাকার সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে আদালতে তোলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শুনানি করেন। শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে জামিন ও রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন আইনজীবী ইবনুল কাওসার ও এ বি এম হামিদুল মেজবাহ।
রিমান্ডের আবেদনে বলা হয়, এ মামলার ১ নম্বর আসামি শেখ হাসিনা ও ৩ নম্বর আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্যরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তার নাম-ঠিকানা এবং মামলার তদন্ত সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য মামলার তদন্তে সহায়ক হবে। আবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে চিরতরে পালিয়ে যাওয়াসহ তদন্তে বিঘœ ঘটার শঙ্কা রয়েছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
এজলাসের কাঠগড়ায় প্রায় ২০ মিনিট হাজির ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। সে সময়ে তিনি ছিলেন নিশ্চুপ ও বিমর্ষ। শুনানি ও আদেশ শেষে কড়া নিরাপত্তায় কারাগারে পাঠানোর সময় পুলিশ পরিবেষ্টিত শিরীন শারমিন সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় আদালত অঙ্গনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দেন।
২০ মাসের ধোঁয়াশা
গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ওই বছরের ৫ আগস্ট সংসদ ভবন থেকে পরিবারসহ অজ্ঞাত স্থানে চলে যান বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় শিরীন শারমিন চৌধুরীর অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। তিনি দেশে আছেন নাকি বিদেশে; এ নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছিল কৌতূহল ও অনিশ্চয়তা। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে শিরীন শারমিন স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি দেশের প্রথম নারী স্পিকার এবং সর্বকনিষ্ঠ স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হন তিনি। পরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। স্পিকার হিসেবে পদত্যাগ করার পর তাকে নিয়ে তৈরি হয় জল্পনা ও ধোঁয়াশা। দীর্ঘ ২০ মাসের ধোঁয়াশা ও জল্পনার অবসান ঘটে সোমবার রাতে। রাত দেড়টার দিকে ধানম-ির ১৬ নম্বর রোডের ৫২ নম্বর বাসার ৪/ই ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবির রমনা বিভাগের একটি দল। বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মিছিলে শিরীন শারমিনের নির্দেশে গুলি চালায় পুলিশ। এতে আন্দোলনকারী আশরাফুল ওরফে ফাহিম একটি চোখ হারান। ওই ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ডিএমপির লালবাগ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন ফাহিম। সেই মামলায় আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের সঙ্গে শিরীন শারমিনকেও আসামি করা হয়।
ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, লালবাগ থানার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি মামলা ডিবি-লালবাগ তদন্ত করছে। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শিরীন শারমিনকে আদালতে তোলা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিরীন শারমিনকে দুদিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
১৯৬৬ সালের ৬ অক্টোবর নোয়াখালীর চাটখিলে জন্ম নেওয়া শিরীন শারমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং আইন পেশায় যুক্ত হন। সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়জুড়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। রংপুর-৬ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও তিনি আলোচনায় ছিলেন। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি। শিরীন শারমিনের অনুপস্থিতিতেই সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ, নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনসহ অধিবেশন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থেকে যান। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।
ওই বছর নভেম্বরে পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, শিরীন শারমিন চৌধুরী ‘সাধারণ পাসপোর্টের’ জন্য যে আবেদন করেছেন তার কার্যক্রম মামলার কারণে ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে। তার কূটনৈতিক পাসপোর্টটি অন্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্টের মতো আগেই বাতিল করা হয়েছে এবং তাকে নতুন কোনো পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি।