পিরোজপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা বলেশ্বর নদী এখন হেঁটে পার হওয়া যায়। নাব্য-সংকট, দখল, অপরিকল্পিতভাবে ব্লক নিক্ষেপ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে বলেশ্বর নদী। কোথাও নদীর মধ্যে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। আবার কোথাও কোথাও মানুষ হেঁটেই পার হচ্ছে এপার-ওপার। দ্রুত খনন ও দখলমুক্ত না করলে কৃষি, নৌ-যোগাযোগ ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকূল প্রভাবের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীটি পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর ও নাজিরপুর উপজেলা এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, চিতলমারী ও কচুয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কার্যত নদীটি দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট ও পিরোজপুরের সীমানা নির্ধারণ করেছে। দুই পাড়ের শতাধিক গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। এদিকে নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাবে কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থায় চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, বলেশ্বর পাড়ের জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদিত হয়। ধান, গম, আখ, সূর্যমুখী, বাদাম, খেসারি ও বিভিন্ন সবজি চাষ হয় প্রায় বছরজুড়ে। প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমি এই নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নাব্য কমে যাওয়ায় সেচ মৌসুমের শুরুতেই বিপদে পড়েছেন কৃষকেরা। ফলে চরডাকাতিয়া, কৃষ্ণনগর, গরীবপুর, খলিশাখালী ও বোয়ালিয়া এলাকায় সেচ-সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। তারা নদীটি দ্রুত খননের দাবি জানান। তারা বলেন, দ্রুত খনন না হলে কৃষিতে বড় ধস নামবে এবং জীববৈচিত্র্যে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহরিয়ার মোস্তফা বলেন, ‘একসময় এই নদীতে লঞ্চ-স্টিমার চলত। এখন মাঝনদীতে ছোট নৌকাও আটকে যায়। পানি নেই, মাছ নেই খরস্রোতা নদীটা চোখের সামনে মরে যাচ্ছে।’
পিরোজপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, একসময় ইলিশ-চিতলসহ নানা প্রজাতির মাছের ভা-ার ছিল এই নদী। হাজার হাজার জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত বলেশ্বরের নদীর ওপর নির্ভর করে। কয়েক বছরের ব্যবধানে নদীর চেহারা আমূল বদলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন মোল্লা বলেন, দখল ও অপরিকল্পিত বাঁধে বাড়ছে সংকট। নদীর দুই পাড়ে জেগে ওঠা চর দখল নিয়ে প্রভাবশালীদের মধ্যে চলছে লড়াই।
এদিকে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শহর রক্ষা বাঁধের নামে নদীর মাঝখানে ব্লক ফেলায় স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে দ্রুত চর জেগে উঠছে। এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, ‘ব্লকের কারণে নৌযান পাড়ে ভিড়তে পারে না। ডুবোচরের জন্য জাহাজও আসতে পারে না। এতে ব্যবসায় বড় ক্ষতি হচ্ছে।’ খেয়াঘাটের মাঝিরা জানান, বড় কার্গো জাহাজ তো দূরের কথা, এখন ছোট ট্রলার চালাতেও ঝুঁকি নিতে হয়। মাঝনদীর ডুবোচরে আটকে যায় নৌকা, ব্লকে ধাক্কা লেগে ফাটল ধরে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী নির্মল চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘একসময় বলেশ্বর নদী আন্তর্জাতিক নৌপথের অংশ ছিল। নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যে দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল ঝালকাঠি বন্দর ও কাউখালি বাজার। আর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা হয়ে উঠেছিল এই জনপদের প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র। পিরোজপুর ছিল সেই বাণিজ্যপথের ট্রানজিট রুট। নাব্য-সংকটে এখন সেই নদীপথে যাত্রী ও পণ্যবাহী লঞ্চ চলাচল প্রায় বন্ধ। বিকল্প সড়কপথে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’
তিনি আরও জানান, পিরোজপুর শহরের সুপেয় পানিতেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। বলেশ্বর নদীর পানি থেকেই পরিচালিত হয় পিরোজপুর পৌরসভার একমাত্র ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। নাব্য কমে যাওয়ায় পানির প্রবাহ কমেছে, ফলে প্ল্যান্টটি সংকটে পড়েছে। পৌর এলাকার ২ লাখ মানুষ সুপেয় পানির ঘাটতিতে ভুগছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন বলেন, ‘ড্রেজিং হলে নাব্য-সংকট কেটে যাবে। নদীর একটি অংশ ড্রেজিংয়ের জন্য আঞ্চলিক দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
