বাড়ছে ঋণ, পেশা বদলের চেষ্টা জেলেদের

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

পটুয়াখালীর উপকূলে মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দর, কুয়াকাটার সৈকত চ্যানেলে সারি সারি ট্রলার দাঁড়িয়ে। কর্মহীন জেলেদের হাতে জাল নয় এখন দুশ্চিন্তার ভার। সরকার বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গত বছরের ১১ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার নতুন সময়সীমা ঘোষণা করা হয়, যা চলতি বছরও বহাল রাখা হয়েছে। পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর প্রভাব পড়েছে হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।

গত বুধবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়মহিপুর, আলীপুর ও কুয়াকাটার মাছঘাটে জেলেরা ইতিমধ্যে তাদের ট্রলার তীরে তুলে রেখেছেন। কেউ জাল সেলাই করছেন, কেউ ট্রলার মেরামত করছেন। কিন্তু কাজের এই ব্যস্ততা কেবল সময় কাটানোর জন্য, আয়ের কোনো পথ নেই।

ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ৫২ বছর বয়সী জেলে রফিক মাঝি। তার চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মাছ ধরি। অন্য কাজ জানি না। আয় বন্ধ, খরচ তো থেমে নেই।’

চার সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা তার। ইতিমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন মহাজনের কাছ থেকে। পাশাপাশি এনজিওর কিস্তিও চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই সরকারি সহায়তা দরকার। আর ঋণের কিস্তি বন্ধ না হলে টিকে থাকা কঠিন।’

উল্লেখ্য, নিষেধাজ্ঞা চলার সময়ে জেলেদের জীবিকা সুরক্ষায় সরকার বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে। ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় উপকূলের ১৪ জেলার ৬৭টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরের মোট ৩ লাখ ১১ হাজার ৬২ জন সমুদ্রগামী জেলেকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ৫৮ দিনের জন্য খাদ্যসহায়তার চাল দেওয়া হবে।

তবে সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল পেলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ৪০ বছর বয়সী জেলে ফারুক মাঝির কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে কম পাই। আর চাল দিয়ে তো সব হয় না, তেল, ডাল, ওষুধ আরও অনেক জিনিস লাগে।’

তার মতে, অন্তত নগদ ৫ হাজার টাকা সহায়তা না পেলে এই সময়টা পার করা কঠিন।

‘ঋণ বাড়ছে, মাছ কমছে। তাই ভাবছি এই পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো শিখব’বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভেঙে আসে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ঢেউ লেগেছে পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে।

মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কর্মচারী কবির হোসেন বলেন, ‘বাজারের সবকিছুর দাম বাড়তি। আয় না থাকলে সংসার চালানো যায় না।’

আলীপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী আবদুল জলিল ঘরামী জানান, ‘জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক সময় অগ্রিম দিতে হয়। কিন্তু সবারই তো সীমা আছে।’

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, পটুয়াখালীর আট উপজেলায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬৩ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৭৫০ জন ভিজিএফ সহায়তার আওতায় রয়েছেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, ‘নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রতিটি নিবন্ধিত জেলেকে পর্যায়ক্রমে ৭৭ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘নগদ সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে জেলেরা ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে পারেন।’

প্রতি বছরই এই নিষেধাজ্ঞা আসে, আবার শেষও হয়। কিন্তু জেলেদের জীবনে জমতে থাকা ঋণ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা যেন শেষ হয় না। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তোলেনসমুদ্রের মাছ রক্ষা পাচ্ছে, কিন্তু সেই সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো কি নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকছে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত