ক্ষতি জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

রাজবাড়ীতে চলতি বছর ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি জমি। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে সভা-সেমিনার করেও কৃষকদের বোঝানো যাচ্ছে না।

কৃষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তামাক চাষ করতে নিজস্ব কোনো পুঁজি দরকার হয় না। চাষের শুরু থেকেই বীজ, সার ও নগদ অর্থ সরবরাহ করে টোব্যাকো কোম্পানি। এরপর মৌসুম শেষে তামাক পাতা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হলে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা চলে আসে। আবার অন্য ফসলের চেয়ে লাভও অনেক বেশি। এ কারণে অনেকেই এখন তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছর ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮ হেক্টর জমি বেশি। জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ১০ হেক্টর করে, কালুখালী উপজেলায় ৮ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ৪ হেক্টর ও পাংশায় ১ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মাতীরবর্তী এলাকায় বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠে বেশির ভাগ জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। কিছু জমিতে সবুজ ভুট্টার গাছ বাতাসে দোল খাচ্ছে। মাঠের বিভিন্ন স্থানে তামাক পাতা শুকানোর জন্য বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে। কোনো কোনো ঘরে তামাক পাতা প্রায় শুকিয়ে গেছে। কেউ কেউ তামাক গাছ থেকে তামাকের পাতা ভাঙছেন। কেউ পাতাগুলো রশির সাহায্যে টংঘরে রৌদ্রে শুকাতে দিচ্ছে। কোনো কৃষক আবার ক্ষেত থেকে তামাক পাতা তুলে মাথায় করে সেগুলো বাড়িতে নিচ্ছেন। এ সময় কৃষদের সঙ্গে তাদের পরিবারে নারী সদস্যদেরও তামাকের জমিতে কাজ করতে দেখা যায়। চরনারায়ণপুর ছাড়াও সদর উপজেলার মহাদেবপুর, জৌকুড়া, কালুখালীর মহেন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন মাঠে একই চিত্র দেখা যায়।

চরনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক মান্নান ম-ল দুই বিঘা জমিতে তামাকের আবাদ করেছেন। মান্নান ম-ল বলেন, ‘তামাক চাষ করতে প্রচুর কষ্ট। কিন্তু টাকাও বেশি। তামাকে যে পরিমাণ টাকা পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো ফসলে আসে না। দুই বিঘা জমিতে এক লাখের ওপরে লাভ হবে। কোম্পানি আমাদের বীজ, সার ও নগদ অর্থ দিয়েছে। এখন তাদের কাছে বিক্রি করলে তারা আগে সেই টাকা কেটে নেবে।’ তামাকের জমিতে কাজ করলে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছেÑএমন প্রশ্নের উত্তরে মান্নান ম-ল বলেন, তামাকে শরীরের ক্ষতি হয়Ñএটা তিনি জানেন। তারপরও টাকার জন্য তিনি এই চাষাবাদ করছেন।

সুজন সরদার নামে আরেক কৃষক বলেন, তিনি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দুই বিঘা জমি ইজারা নিয়ে তামাক চাষ করেছেন। গত বছরও এই জমিতে তামাকের আবাদ করেছিলেন। গত বছর ভালো লাভ হয়েছিল। টোব্যাকো কোম্পানির কাছে তিনি ট্রেনিং নিয়েছেন। তাকে তামাকের জমিতে কাজ করতে বুট, হ্যান্ডসগ্লাপস-সহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়েছে কোম্পানি। কোম্পানির কাছ থেকে তিনি নগদ অর্থও সহযোগিতা পেয়েছেন। ধান চাষ করতে যে পরিমাণ খরচ হয় তাতে বেশি লাভ হয় না। তামাকে লাভ অনেক বেশি হওয়ায় তিনি তামাকের আবাদ করেছেন। তার মতো অনেক কৃষকই এই বছর তামাক আবাদ করেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তামাক একটি মাদকদ্রব্য জাতীয় ফসল। এটি চাষে আইনগতভাবে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা নেই। কৃষক তার ইচ্ছানুযায়ী ফসল চাষাবাদ করে। আমরা কৃষকদের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করছি। আমরা কৃষকদের তামাকজাত ফসলের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদে উৎসাহ দিচ্ছি। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক সহযোগিতায় কৃষক এই ফসল উৎপাদন করছে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহযোগিতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত