মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণ: বাংলাদেশের অলিখিত উপনিবেশায়ন ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘একটি পুরো সভ্যতা আজ রাতে ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে দেওয়া হুমকির মাত্র ৮৮ মিনিট আগে একটি অভূতপূর্ব ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন এই যুদ্ধবিরতিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য স্বস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, তিনি এটিকে অত্যন্ত ভঙ্গুর বলেই অভিহিত করেন। এই স্বল্প সময়ের অবকাশের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিজেদের জয় ঘোষণায় মেতে উঠেছে। পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এটিকে ‘বড় ধরনের সামরিক বিজয়’ এবং ‘ঐতিহাসিক ও অপ্রতিরোধ্য’ বলে দাবি করেন, অন্যদিকে তেহরানেও একই উচ্চতায় নিজেদের সফলতা ঘোষণা করে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ লিখেন, ‘বিশ্ব ক্ষমতার এক নতুন কেন্দ্রের সূচনা হয়েছে’। এই দুই বিপরীতমুখী বক্তব্য পরিষ্কার করে দেয় যে আসল শান্তির পথ কতটা কঠিন।

এই যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতাকে আরও বাস্তবে রূপ দিতে ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে অনুষ্ঠিত এই আলোচনাটি ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক। টানা ২১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস আলোচনাও ব্যর্থ হয়, কোনো ধরনের শান্তি চুক্তি ছাড়াই তা শেষ হয়ে যায়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরান পরমাণু অস্ত্র না তৈরির শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আলোচনার মূল টানাপোড়েন কেন্দ্র করে ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির মেয়াদ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের স্থগিতাদেশ চাইলেও ইরানের পাল্টা প্রস্তাব ছিল মাত্র পাঁচ বছরের অবকাশ। এর পাল্টা জবাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না করে, তাহলে ইসরায়েল আরও ‘ভয়াবহ’ হামলা চালাবে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরও ট্রাম্প দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ‘খুব কাছে’ পৌঁছে গেছে এবং ইরান তাদের ‘পারমাণবিক ধূলিকণা’ উদ্ধার ও যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরে রাজি হয়েছে। যদিও তেহরান এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে স্থানান্তরের প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য ২০ এপ্রিল আবারও ইসলামাবাদে বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কিন্তু ২২ এপ্রিল শেষ হতে চলা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে। ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে চুক্তি না হলে হয়তো তিনি যুদ্ধবিরতি বাড়াবেন না এবং আবার ‘বোমা ফেলতে শুরু করবেন’।

পারমাণবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ‘দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে’ এবং সংস্থাটির কাছে ইরানের কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। যদিও গ্রোসি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি খারিজ করে বলেছেন যে বর্তমান প্রমাণ ইরান পরমাণু বোমা তৈরির কাছাকাছি পৌঁছেছে-এই মূল্যায়নকে সমর্থন করে না। বিশ্লেষকদের মতে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, যা প্রয়োজনে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অস্ত্র-গ্রেডের (৯০ শতাংশ) উপাদানে রূপ নিতে পারে।

তবে যুদ্ধবিরতির এই জটিল বাস্তবতাকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে ইসরাইলের অবস্থান। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরবর্তীতে টানাপোড়েনে পরিণত হয়। ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথে হাঁটছেন, নেতানিয়াহু তখন লেবাননে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে থাকেন। স্পষ্টতই, নেতানিয়াহুর কাছে হরমুজ প্রণালির চেয়ে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের উপস্থিতি অনেক বেশি হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্প চান ওই জলপথে তেলবাহী জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে। ফলে ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুকে ফোন করে লেবাননে সামরিক অভিযান ‘সীমিত’ রাখতে বলা ছাড়া উপায় ছিল না।

এই যুদ্ধবিরতি লেবাননকে সুরক্ষা দেয়নি বরং এরই সুযোগ নিয়ে ইসরাইল যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনেই লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ইসরাইলি বাহিনী কমপক্ষে ৩০৩ জন নিরীহ নাগরিককে হত্যা করে এবং আরও ১ হাজার ১৫০ জনকে আহত করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে ‘বেআইনি আগ্রাসন ও নির্বিচার বোমা হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে লেবাননে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৯০০ ছাড়িয়েছে; সর্বশেষ হিসাবে ১৭ এপ্রিল নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,২৯৪-এ, যেখানে নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ২৭৪ জন নারী ও ১৭৭ জন শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো একে ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর নতুন সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত করছে, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যের পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনেন। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ইসরাইলকে ‘পৃথিবীর ক্যানসার’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের সৃষ্টি করেন এবং তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরাইল লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম শহরে ইসরাইলি বাহিনী বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। একইসঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের ওপর হামলায় ফরাসি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ১৬ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আরেকটি দশ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। হিজবুল্লাহ এতে ‘সতর্ক প্রতিশ্রুতি’ দিয়েও যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি হয়েছে। ইসরাইল অবশ্য লেবাননসহ সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ জারি রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সেন্ট্রাল কমান্ডের ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে, এবং কোনও ইরানি নৌযান যাতে এই অবরোধ ভাঙতে না পারে সেদিকে কঠোর নজর রাখা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির অবস্থাও দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ইরান প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানবিরোধী নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে। ১৮ এপ্রিল কয়েকটি তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার প্রণালিটি অতিক্রম করলেও, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গানবোট দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালায়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেলে প্রণালিটি আবারও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।

হোয়াইট হাউস এবং ইম্পিচমেন্টের রাজনীতি

ট্রাম্পের এই যুদ্ধ পরিচালনা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। একদিকে ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছেন ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’, অন্যদিকে তিনি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে নিজের কথার পরস্পরবিরোধিতা নিজেই প্রমাণ করছেন। আরব আমিরাত ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্রের মতে, ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবিত ১০-দফা শান্তি পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলের অনুমোদন না পাওয়ায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স এই যুদ্ধবিরতিকে ‘ভঙ্গুর সমঝোতা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

এই চরম অনির্দিষ্টতার জের ধরেই কংগ্রেসে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্টের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। ৫ এপ্রিল মার্কিন কংগ্রেস সদস্য জন লারসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইম্পিচমেন্টের প্রস্তাব আনেন, যেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প বারবার কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা লঙ্ঘন করেছেন এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত। লারসন আরও বলেন, ট্রাম্প ‘ক্ষমতার সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে’। সম্প্রতি এই প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জেমি রাসকিন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ‘ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা’ প্রমাণিত হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে তাঁকে অপসারণ করা যেতে পারে। ট্রাম্পের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস’-এর হুমকি এবং সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘যিশুখ্রিষ্ট’ হিসেবে চিত্রিত করার বিতর্কিত পোস্ট এই প্রস্তাবের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেত্রী আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কোরটেজ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, এটি গণহত্যার হুমকি এবং প্রেসিডেন্টের মানসিক সক্ষমতা ভেঙে পড়ছে। তিনি প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যের প্রতি বেআইনি নির্দেশ অমান্য করার আহ্বান জানান। প্রাক্তন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি স্পষ্ট ঘোষণা দেন, যে কোনো উপায়ে ট্রাম্পকে সরানো উচিত। যদিও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই ইম্পিচমেন্টের কথা বলছে, তবুও এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইরান যুদ্ধ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।

মার্কিন সিনেটে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত ভোটাভুটিতেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সিনেট আরেকটি ডেমোক্র্যাট প্রস্তাব ৪৭-৫২ ভোটে নাকচ করে দিয়েছে, যা ছিল এ বছর চতুর্থবারের মতো কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের হাতে যুদ্ধের লাগাম ছেড়ে দিল। তবে রিপাবলিকান সিনেটররাও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হলে তাঁরা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া আরও যুদ্ধ চালানোর পক্ষে নাও থাকতে পারেন। ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের আওতায় যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক, আর এই সময়সীমা এপ্রিল শেষে পূর্ণ হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি পরাজিত হলে তার বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এই স্বীকারোক্তি আমেরিকান রাজনীতির বর্তমান ভাঙন ও অস্থিরতার একটি স্বচ্ছ দলিল।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্দি বিনিময়ের জটিলতাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন জিম্মি আলোচক রজার কার্সটেনস সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান বন্দি ইস্যুটিকে পরমাণু আলোচনায় ‘মিষ্টান্ন’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দেবে। ইরানের ইভিন কারাগারে এখনও ছয়জন মার্কিন নাগরিক বন্দি আছেন, যাদের মুক্তি না হলে কোনো চুক্তি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি: আশির্বাদ না অভিশাপ?

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ (এআরটি) বাণিজ্য চুক্তি। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অতি গোপনে ও তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বাণিজ্য চুক্তি হলেও এর শর্তাবলি পরীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়, এটি একটি একপেশে ও বৈষম্যমূলক দলিল। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজের ভাষ্যমতে, একটি সত্যিকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত হয়, কিন্তু এই চুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।

এই চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, ৩২ পৃষ্ঠার এই দলিলে ‘Bangladesh shall’ বাক্যাংশটি ১৫৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে, অথচ ‘United States shall’ মাত্র ৯ বার। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে শুল্কসুবিধা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে বাংলাদেশ বার্ষিক ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র 19 শতাংশ করা হয়েছে, কিন্তু বিদ্যমান ১৫.৫ শতাংশ শুল্ক মিলিয়ে মোট কার্যকর শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় ৩৪.৫ শতাংশে।

এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের মাধ্যমে। আদালত জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি ভিত্তিতে আরোপিত শুল্ক আরোপ বেআইনি। এই রায়ের ফলে এআরটি চুক্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেন যে এই চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এর চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক হলো কৌশলগত ও রাজনৈতিক শর্তাবলি। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যাদের যুক্তরাষ্ট্র তার ‘স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে। এর ফলে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে পারমাণবিক খাতে কাজ করা প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চুক্তির ৪.৩ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার মতো ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’-এর সঙ্গে কোনো মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। অর্থাৎ, বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার-বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ বাংলাদেশকে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, যা ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর একটি বিশাল বোঝা। আকাশযান কেনার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশকে এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দিয়েছে, যার ফলে বিমানের বহর আধুনিকীকরণ নিয়ে এক জটিল প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট এবং নিষেধাজ্ঞার জটিলতা

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক সমুদ্রবাহী অপরিশোধিত তেল পরিবহন ১৬ শতাংশ কমে গেছে, যার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৭৬ লাখ ব্যারেল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করেছে যে মে মাসে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গত মার্চ মাসে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড ৫০ শতাংশ বেড়েছিল, যা সম্প্রতি কিছুটা কমে ৯০ ডলার পরিসরে স্থিতিশীল হলেও এখনও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। ইয়েস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যে বিশ্ববাজারে ২৩ লাখ ব্যারেল উদ্বৃত্ত ছিল, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তা দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এটা ছিল এক মারাত্মক ধাক্কা, কারণ দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানি করে থাকে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রাশিয়া থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়।

তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির শর্তের কারণে নিজের ইচ্ছামতো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকার একটি চতুর কৌশল গ্রহণ করেছিল-রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতে শোধন করে তা আমদানির পরিকল্পনা। এই পদ্ধতিতে নিষেধাজ্ঞার কাঠামোর মধ্যে থেকেও রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সংকটে স্বস্তি বয়ে এনেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বা তেল কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের ছাড় দিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়টি ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর আগে ১২ মার্চ ৩০ দিনের যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, সমুদ্রে তেলবাহী কোনো জাহাজ না থাকায় তা কাজে আসেনি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়া থেকে ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া এখনো শুরু না হলেও আলোচনা চলছে। এই উদাহরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশ কতটা বন্দি অবস্থায় রয়েছে-প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির জন্যও তাকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে এবং সেই অনুমতি পাওয়ার পরও তা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বন্দি।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব: প্রবাসী আয় ও রেমিট্যান্স সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত-প্রবাসী আয় ও রেমিট্যান্সের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গালফ দেশগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন, যারা ২০২৫ সালে প্রায় ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে একা জিসিসি দেশগুলো থেকে আসে প্রায় ৪৬ শতাংশ বা প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে ৯৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে, এবং প্রায় ১৬ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক দেশেই আটকা পড়েছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহে এখনো বড় ধরনের ধস না নামলেও, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করেছে যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে লেবানন ও কুয়েতে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতন বন্ধ বা হ্রাস পেয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

গোটা প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ করণীয়

মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের পরিণতি পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। যখন ইসরাইল লেবাননে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আমেরিকা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় জর্জরিত, তখন বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি পুঁজি করছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি শুধু একটি অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, বরং এটি একধরনের অলিখিত উপনিবেশায়নের সূচনা। বাংলাদেশকে বাধ্য করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে সম্পূর্ণরূপে সংযুক্ত করতে। এই অস্থির সময়ে রাশিয়া, চীন ও ইরানের যৌথ নৌ-অভিযান ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি বেল্ট ২০২৫’ সম্প্রতি ওমান উপসাগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা বিশ্বশক্তিগুলোর নতুন মেরুকরণেরই ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশের জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন ও সজাগ হতে হবে। ‘আমেরিকা যে দেশে বন্ধু হয়ে ঢোকে, সে দেশ আর দেশ থাকে না’-এই প্রবাদটি আমাদের সামনে আরেকবার বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা-কোনো দেশই এই প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পায়নি। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। আমাদেরকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আমরা কি শুধু আরেকটি উপনিবেশ হয়ে যাব, নাকি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এক হয়ে দাঁড়াব? কূটনৈতিকভাবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া, ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এগোতে হবে। শুধু আমেরিকার প্রেসক্রিপশনে চললে দেশ এগোবে না, পিছিয়ে যাবে-এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও পরিবেশবাদী  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত