ভর্ৎসনায়ও শোধরালেন না তিনি!

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ এএম

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে নদীবন্দরের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন মোহাম্মদ আবদুল ওয়াকিল। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান কক্সবাজার সফরে গেলে মন্ত্রীর কাছে একজন স্থানীয় ইজারাদার, বাঁকখালী নদীতে উচ্ছেদ হওয়া মালামালের নিলামকারীসহ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি আব্দুল ওয়াকিলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। মন্ত্রী আব্দুল ওয়াকিলকে তাৎক্ষণিকভাবে ভর্ৎসনা ও সাবধান করলেও তিনি শোধরাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তারা বলেন, আব্দুল ওয়াকিল উল্টো অফিসে অনুপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছেন। অধীনস্থ এক কর্মচারীকে মারধর করে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, অধীনস্থদের ব্যবহার  করে ঘুষ আদায়, টাকার জন্য ইজারাদারদের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও নিরীহ লোকজনকে হয়রানি করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। 

অবশ্য ওই কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নিয়মনীতি মেনে সরকারি কাজ করতে যাওয়ায় তার কিছু ব্যক্তিগত শত্রু জন্ম নিচ্ছে। তারাই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আবদুল ওয়াকিল কক্সবাজারের নদীবন্দরের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করাসহ অনিবন্ধিত ফিশিং ট্রলার, যাত্রীবাহী গামবোট ও ব্যবহার অনুপযোগী স্পিডবোট থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় এবং বালু ও পাথরবাহী ভলগেট, ট্রলার মেরামত স্থান ডক থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিআইডব্লিউটিএ অফিসে গুঞ্জন রয়েছে যে, আব্দুল ওয়াকিলকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে শহরের টেকপাড়ার মাঝের ঘাট ইসলামী বরফকলের পেছনের বাঁকখালীর জমি ভরাট করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। তিনি কস্তুরাঘাটের উচ্ছেদকৃত জায়গায় অর্থের বিনিময়ে স্থাপনা নির্মাণেরও সুযোগ করে দিচ্ছেন।

কস্তুরাঘাটস্থ উকিলপাড়া সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী শেখ নেওয়াজ রানা বলেন, আমাদের জমি প্রবাহ নদী থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে এবং সমাজ কমিটির সবার জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। কিন্তু সেই জমিতে আমরা কিছু করতে গেলেই আবদুল ওয়াকিল বাধা দেন। অথচ তার নাকের ডগায় নদীর জমি একের পর এক দখল হচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি নির্বিকার। তিনি আরও বলেন, নানা মাধ্যমে আব্দুল ওয়াকিল আমাদের কাছে টাকা দাবি করে কিন্তু আমরা সেই টাকা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি আমাদের অনেককেই মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করেছেন। এ ছাড়া তিনি আমাদের ব্যাপারে সামাজিক মাধ্যমে নানা কুৎসা রটাচ্ছেন।

কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সদস্য সেজান এহেছান বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা ব্যক্তি স্বাধীনতা। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারেন না। যেমন আদালত থেকে প্রমাণিত না হওয়ার আগে তিনি কাউকে চাঁদাবাজ, দখলবাজ বলতে পারেন না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল নৌ-মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআইডব্লিউটিএর  চেয়ারম্যান ও পরিচালক আরিফ হাসনাতসহ নৌপ্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান একদিনের সফরে কক্সবাজার আসেন। প্রতিমন্ত্রী সেদিন খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত কস্তুরাঘাট ব্রিজ পরিদর্শন করেন। প্রতিমন্ত্রী সেপ্টেম্বরে উচ্ছেদ হওয়া নদীর জমি ফের দখল হওয়ায় কক্সবাজারের নদীবন্দর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল ওয়াকিলকে ভর্ৎসনা করেন এবং তাকে সরিয়ে ফেলা হবে বলে সাবধান করে দেন। ওইদিন কক্সবাজার বিমানবন্দরে উপস্থিত এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় একজন ইজারাদার, বাঁকখালী নদীতে উচ্ছেদ হওয়া মালামালের নিলামকারীসহ কয়েকজন গণ্যমান্য লোক প্রতিমন্ত্রীর কাছে আব্দুল ওয়াকিলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করা, অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও বিভিন্ন জায়গা থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ করেন। তখন মন্ত্রী বিমানবন্দরে আব্দুল ওয়াকিলকে সাবধান করেন।

আব্দুল ওয়াকিল তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছয় মাস হয়েছে কক্সবাজার এসেছি। এই সময়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি তিনটি মামলা করেছি। এতে অনেক আইনজীবী, ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা আমাকে ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে গণ্য করছেন। কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাটের ইজারাদার অলি উল্লাহ মিন্টুর বিরুদ্ধে মহেশখালীর এক সমন্বয়ক একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেই অভিযোগের পরিপেক্ষিতে আমি ইজারাদারকে শোকজ নোটিস পাঠাই। ওই নোটিস পেয়ে ইজারাদার মিন্টু আমাকে ব্যক্তিগত শত্রু গণ্য করে আমার ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএর রেস্ট হাউজটিকে আমি নিয়মনীতির মধ্যে আনার চেষ্টা করায় আমার অধীনস্থ অনেকে আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। এই তিন শক্তি মিলেই এখন আমার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’

তবে সামাজিকমাধ্যমে লেখালিখির বিষয়ে মোহাম্মদ আবদুল ওয়াকিল বলেন, ‘সামাজিকমাধ্যমে আমি লিখি, আমার কাজ ও আমার সম্পর্কে জানানোর জন্য। যাতে আমার ব্যাপারে সমাজে কোনো ভুল তথ্য না ছড়ায়। এই লেখাতে হয়তো কিছু রুঢ় শব্দ ব্যবহার হয়, কিছু বাক্য এলোমেলো হয়। কিন্তু যা লিখি তা সত্যই লিখি।’

নিয়মিত অফিস না করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তার বাইরে আমার একটি ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে। আমার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। এজন্যই আমি কাজ শেষ করে সুযোগ পেলেই পরিবারের কাছে যাই।’

অধীনস্থ মালিকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে ওয়াকিল বলেন, কেন তাকে মারধর করেছি, এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই বিষয়ে আমি বাইরে কথা বলতে চাই না।

ওই মালি বলেছেন, ‘বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ এটি নিয়ে আমি মিডিয়াতে কথা বলতে চাই না। তবে এ ব্যাপারে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ লিখিত জানিয়েছি।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ‘আমরা আবদুল ওয়াকিলের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছি। তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। পাশাপাশি মালিকে মারধরের বিষয়টিও আমাদের নজরে রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে তাকে সাবধান করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত