সাংবাদিকের কল্যাণ টাকা না মর্যাদায়

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১১ এএম

ঘটনা বা প্রসঙ্গক্রমে মাঝেমধ্যে আলোচনায় উঠে আসে, সাংবাদিক কল্যাণের কথা। সংসদে এক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে নতুন করে এসেছে, সাংবাদিকদের অবসরভাতা প্রসঙ্গ। বাগেরহাট-৪ এর বিরোধীদলীয় সদস্য মো. আব্দুল আলীমের টেবিলে উত্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন টেনে এনেছেন, সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক অনেক কথা। জানিয়েছেন   সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন, প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা নিশ্চিতকরণ ও ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ, অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাদ পড়েনি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ-পিআইবির মাধ্যমে এআই প্রশিক্ষণ, ন্যারেটিভ  তৈরি, তথ্যের বিষয়ে নীতি সহায়তা ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা। অনেকটা গর্বের সঙ্গে দিয়েছেন, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১১০ জন অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক এবং নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান দেওয়ার তথ্য। ৪০২ জন সাংবাদিক পরিবারের মেধাবী সন্তানদের ৭৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া, গেল রমজানে ২ হাজার জন সাংবাদিক পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ইফতার ও ঈদ উপহার দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি এও জানান, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার রোধে তথ্য অধিদপ্তর থেকে ২২টি ফটোকার্ড ও গুজব প্রতিরোধ বিষয়ক ১০টি তথ্যবিবরণী, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও নিউজ পোর্টালে প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনাসভা ও সেমিনার আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বিস্তারিত তথ্যের মধ্যে গুরুত্ব পেয়েছে, দেশের প্রবীণ সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবসরভাতা চালুর লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগের কথা।

১৮ এপ্রিল রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক সাংবাদিককে দেখতে গিয়ে, প্রবীণ সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা হয়। অনেক প্রবীণ সাংবাদিক, জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক কষ্টে দিন কাটান বলে দুঃখপ্রকাশ করেন। সাংবাদিকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে, সরকার অগ্রাধিকার দেবে বলে জানান। আর সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অসুস্থ ওই সাংবাদিকের হাতে এক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সাংবাদিকদের কল্যাণ কেবল আর্থিক অনুদান বা সাময়িক সহায়তা? এর চেয়ে কি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি নয়? বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের প্রকৃত কল্যাণের সঙ্গে, পেশাগত সুরক্ষা অত্যন্ত প্রত্যাশিত। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হুমকি, হামলা বা ডিজিটাল হয়রানির যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। সাংবাদিকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ৯ম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের আইনি জটিলতা নিরসন এবং নতুন করে ১০ম ওয়েজবোর্ড গঠন হলে, কাউকে মৃত্যুর আগে কিছু টাকা দিয়ে ফটোসেশন করা লাগবে না।

প্রকৃত সাংবাদিকদের শনাক্ত এবং ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে প্রেস কাউন্সিল যে অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির চেষ্টা করছে, সেটির কাজ শেষ করাও জরুরি। সেটা হবে সম্মানের, প্রকৃত কল্যাণেরও। আবেদন-নিবেদন থাকবে, তা করতে গিয়ে যেন দল-মত বিবেচ্য না হয়। এমনিতেই দলীয়পনায় সাংবাদিকদের অমর্যাদা-অকল্যাণ যথেষ্ট হয়ে গেছে। প্রবীণ-নবীন ভেদও কমে গেছে। প্রবীণের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং সততা প্রায়ই বিবেচ্য হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, সাংবাদিকের মানরক্ষা। শারীরিক সক্ষমতা গুরুত্ব পাক। একদিন সবাই প্রবীণ হবেন। কিন্তু প্রবীণ সাংবাদিকের যন্ত্রণা ভিন্ন। এটি কোনো পেশার মানুষের সঙ্গে মেলানো যাবে না। পেশাদারিত্বও একটি কাঠামোতে নিয়ে আসা গেলে সাংবাদিকদের মর্যাদা বাড়বে। সাংবাদিকদের তাচ্ছিল্য, অগ্রাহ্য এবং মাঝেমধ্যে নিগৃহীত করা দেশে দেশে এখনো চলমান। সাংবাদিকরা পৃথিবীর সবচেয়ে অসৎ মানুষ দায়িত্ব নিয়েই এ বাণী দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই কিসিমের কথা বাংলাদেশের বাজারে ছাড়া হয়েছে আরও আগে। তাই বলা যায়, ট্রাম্প আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। গেল জাতীয় সংসদে ফাঁকা মাঠে প্রায়ই সাংবাদিকদের তুলোধুনা করতেন মাননীয় কয়েক সদস্য। গুলিতে নিহত গাইবান্ধার বহুল আলোচিত এমপি লিটনকে নিয়ে, শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে তারা সাংবাদিকদের কী ধোলাই করেছিলেন একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তা এখনো চোখে ভাসে, কানে বাজে। তারা বলেছিলেন, বড় বে-গুনাহগার ছিলেন ওই মাননীয়। গুলিগালাজে এক্সপার্ট এই মান্যবর ছিলেন,  অক্সফোর্ডের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ, সাংবাদিকরা এই ভালো মানুষটাকে নিয়ে রটিয়েছে আজেবাজে কথা। শিশু সৌরভকে গুলি করাসহ তাকে জড়িয়ে রটনাগুলো সাংবাদিকদেরই কাজ। এর আগে, তখনকার মাননীয় অর্থমন্ত্রী কয়েকবার সাংবাদিকদের সম্বোধন করেছেন ‘রাবিশ’ নামে। এক সময়ের বহুল আলোচিত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী বেশ ক’বার বলেছেন, সাংবাদিকরা ‘খবিশ’। মহান সংসদের এক সময়ের মহান বিরোধীদলীয় নেত্রী সাবেক ফার্স্টলেডি রওশন এরশাদ তো মাঝেমধ্যেই, ভীষণ স্নেহ দান করেছেন সাংবাদিকদের। দরদি হয়ে  বলেছেন, ‘দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায়, পোলাপাইনগুলা সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে।’  ‘সাংবাদিক’ নামের এই নিরীহ শ্রেণিকে নিয়ে, গালমন্দ করা যায় অবাধে। সাংবাদিকদের সম্পর্ক যে কেউ যেকোনো মন্তব্য করতে পারেন। এতে কোনো সমস্যা হয় না। হয় না শক্ত কোনো প্রতিবাদ। আবার দরকার পড়লে সমালোচকদের অনেকে সাংবাদিকদের তোয়াজ করেন। কাজে খাটাতে না পারলে করেন গুষ্টি উদ্ধার। সাংবাদিকদের গোনায় ধরা বা আমল দেওয়ার দরকার মনে করেন না মহাশয়রা। শুধু নিজেদের প্রচার ও কাভারেজের জন্য, মাঝেমধ্যে সাংবাদিকদের সম্মানের ডগায় একটু-আধটু চুলকানি দেন তারা। সেটা মোটেই কদর দেওয়া নয়। বেশিরভাগ সাংবাদিকই তা মালুম করেন না। বরং নিজের ওজন কমানোর যাবতীয় বন্দোবস্ত নিজেই করেন। সাংবাদিকদের ওজন করার পাল্লা-বাটখারার কেন এ অবস্থা? কেন সাংবাদিকদের ‘সাংঘাতিক’ বলে আদর করার মাত্রাটা ক্রমেই বাড়ছে? ইদানীং তেলবাদিক বিশেষণ যোগ হয়েছে আমাদের ঝুড়িতে। ‘চামবাদিক’র মতো শব্দের ঢিলও ছোড়া হয়। চামেচুমে সাংবাদিকরা এদিক-সেদিক নানা কিছু করেন বলে না-কি নাম দেওয়া হয়েছে,  চামবাদিক। আর ফাঁকেফুকে নানান দিকে ঢুঁ মারার দোষে ‘ফাঁকবাদিক’ নামকরণ। কেন এই দশা হলো আমাদের? আশপাশে, কাছে কিনারে কেন এমন নিপাতনে সিদ্ধ হচ্ছি আমরা! এরপরও কেন গায়ে পানি লাগে না সাংবাদিকদের? রাজধানীতে বাড়িভাড়া বা আত্মীয়তার প্রার্থিতাসহ সামাজিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কী অবস্থা-অবস্থান আমাদের? এই হাল নমুনায়ও কি কোনো বোধবুদ্ধি আসতে নেই?

অথচ পেশা হিসেবে অত্যন্ত সম্মানজনক ও চ্যালেঞ্জিং পেশাটির কর্মীদের এমনটি হওয়ার কথা ছিল না, তা হওয়ার কথা নয়। সাংবাদিকরা মেধা-শ্রম নির্ভর। এই পেশাজীবীরা চ্যালেঞ্জ জয় করেন অভিজ্ঞতা, বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে। অন্য পেশায় এটি এত চোখা নয়। তারা আগে থেকেই জানেন, আজ তার কোন ধরনের কাজ করতে হবে। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রতিদিন মোকাবিলা করতে হয় নতুন কাজ। অথচ মর্যাদার প্রশ্নে তারা কেন এত বোধহীন, বহিমিয়ান? কিছু তস্কর, আতিপাতি গোটা পেশাটার এই দুর্গতির কারণ হয়ে থাকলে এখন শুদ্ধ হতে বাধা কোথায়? নানা নিপাতনে সিদ্ধতার পর, শুদ্ধতা একটু সহজই হওয়ার কথা।  সাংবাদিকতা বাংলাদেশেও এখন একটি পরিপূর্ণ পেশা। মোটেই শখ মেটানোর ব্যাপার নয়। স্বেচ্ছাশ্রমে খাটার দিনও শেষ। লক্ষ্য-অঙ্গীকারের পাশাপাশি রুটি-রুজি, কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র এটি। জেনে-বুঝে-শুনে, জীবনের লক্ষ্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে  প্রতিবছর সাংবাদিকতা ছাড়াও গণমাধ্যমে বিভিন্ন পদে অভিষেক ঘটছে শত শত তরুণ-যুবকের। কেবল সংবাদপত্রই এখন তাদের কর্মক্ষেত্র নয়। দুই ডজনের বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন, বেশ কটি এফএম রেডিও ছাড়াও রয়েছে, নতুন নতুন অনলাইন মাধ্যম। সময়ের চাহিদা ও দ্রুত উৎকর্ষের সুবাদে সাংবাদিকতার ধরন-ধারা-ধারণা পাল্টে, এসেছে অনেক আপডেট। স্বাধীনতার আগে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ দেওয়া হতো শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তা-ও ডিপ্লোমা এবং নাইট কোর্স। সেটি এখন আর ডিপ্লোমা বা কোর্সের মধ্যে নেই। রাতের ক্লাস এসেছে দিনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের নাম পাল্টে হয়েছে, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়।

প্রতিবছর প্রাইভেট বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রচুর শিক্ষার্থী বের হচ্ছে। উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে তারা যোগ দিচ্ছে গণমাধ্যমে। এরপরও কেন অবহেলা, দোষারোপ সইতে সইতে প্রান্তিকতায় চলে আসা? সাংবাদিকদের আর কত অপদস্থ হওয়া? না বললেই নয়, সাংবাদিকতা মোটেই মুক্ত পেশা নয়। একইসঙ্গে মতপ্রকাশ বা বাকস্বাধীনতা অনেকটা আপেক্ষিক। কত কথা বলতে পারলে বাকস্বাধীনতা হয়, তার সীমানা মানা হয় না। সেখানে যে আরেকজনেরও বাকস্বাধীনতা থাকতে পারে, তা গ্রাহ্য হচ্ছে না। আর সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি গণমাধ্যমে বাকস্বাধীনতার তাত্ত্বিক অর্থ ‘প্রেস ফিডম’ অথবা ‘ফ্রিডম অব প্রেস’। প্রায়োগিকভাবে এ ব্যাখ্যায় প্রেস অর্থ ‘সংবাদক্ষেত্র’ (ছাপাখানা নয়)। আবার সংবাদক্ষেত্রেরও বহুমাত্রিক অর্থ। যেখানে সংবাদ, সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম কর্র্তৃপক্ষ বা মালিকপক্ষ সবাই আছেন। তাদের সবার অর্থাৎ সংবাদের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যম মালিকের স্বাধীনতা মিলিয়ে স্বাধীনতার চৌহদ্দি বেশ বড়। অথচ স্বাধীনতা বা অধিকারের সমান্তরালে দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টি সামনে আনলে, ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার প্রবণতা রয়েছে। সাংবাদিকদের সব আইনের ঊর্ধ্বে রাখা এবং তাদের অবারিত মুক্ত ভাবার মানসিকতাও রয়েছে।  জগতে কারও স্বাধীনতাই অ্যাবসলিউট, আনলিমিটেড বা নিরঙ্কুশ নয়। সব স্বাধীনতাই মাত্রাযুক্ত।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত