‘বাজার সিন্ডিকেট’ সাধারণ জনগণের কাছে একটি পরিচিত শব্দ। বরাবর তা এক ধরনের আতঙ্কের নাম। যার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে, খেটে খাওয়া প্রতিটি মানুষ। বিগত কয়েক বছর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মূল্যস্ফীতি নাগালের বাইরে। এর পেছনে সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে, বাজার সিন্ডিকেট। এই ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কথায়। একজন বলেছেন, ‘সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, এটি দেশ থেকে বিদায় দেব’। অপরদিকে আরেকজন ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে।’ পরস্পর সাংঘর্ষিক কথায় মানুষ দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। প্রত্যেকে প্রত্যাশা করে, বাজার সিন্ডিকেট দূর হোক। সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাক। কিন্তু এর বাস্তবতা কতটুকু? বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও, দেশের জনসংখ্যা ঘনত্ব বেশি। কাজেই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা পণ্যের সামান্য সংকট তৈরি করে, বড় ধরনের আর্থিক লাভ করতে পারে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ স্বল্পশিক্ষিত এবং গুজবে সহজেই বিশ্বাসী হওয়ায়, অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সিন্ডিকেট গঠন সহজ। তাহলে কি জনগণ সিন্ডিকেট তৈরিতে দায়ী? তারা এককভাবে দায়ী না হলেও, কিছুটা দায় অবশ্যই আছে। কেনই বা সাধারণ জনগণ গুজবে কান দেবে? তাই সরকারকে গুজব রটানো প্রতিহত করতে হবে। অনেকে অবাক হবেন, আমরা কীভাবে সিন্ডিকেটকে সহায়তা করি, না বুঝে?
আমরা জেনে বা না জেনে অনেক কিছু বলে ফেলি। কিন্তু তার বিপরীতে কী ঘটতে পারে, তা চিন্তা করার প্রয়োজন বোধ করি না। সরকারে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন, তাদের কখনো বলা সমীচীন নয় যে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর, খাদের কিনারায় বা ব্যাংকব্যবস্থা দুর্বল। যেসব কথায় মানুষ আতঙ্কিত হতে পারে, সেসব না বলা ভালো। অন্যথায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে, পণ্যসামগ্রী মজুদে আগ্রহী হয়, যা সিন্ডিকেট তৈরিতে সহায়তা করে। এর একটি প্রকৃত উদাহরণ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যাংক খাতের সমস্যা সবার জানা। সুশাসন ফেরানোর মাধ্যমে ব্যাংক পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। জোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু ব্যাংক বাঁচানো যাবে না। কেননা, কোনো কোনো ব্যাংক থেকে ঋণের ৮৭ শতাংশই নিয়ে গেছে একটি পরিবার। এসব ঋণ আর ফেরত আসবে না’। এরপর মানুষ আতঙ্কিত হয়ে, ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলন করে নেয়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বিপাকে পড়ে এবং তারল্য সংকট তৈরি হয়।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার বেশ অস্থিতিশীল। অনেকটাই নিশ্চিত, বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারও অস্থিতিশীল হবে। কিন্তু বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘শুধু জ্বালানি নয়, এর প্রভাব পড়ছে সব ধরনের পণ্য, খাদ্যদ্রব্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। ফলে আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’ সুতরাং আপনি চান বা না চান, অসাধু ব্যবসায়ীরা এ কথার ওপর ভিত্তি করে, মজুদ করবেন এবং তাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি পাবে, এমন নিশ্চয়তা থাকায় বাজেটের আগে তামাকজাতীয় পণ্যে চরম সংকট দেখা দেয়। দাম বাড়ার পর, আবার তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। আবার বর্তমানে সরকার বলছে, তেলের সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেলে কিছুটা হলেও চাহিদা স্বাভাবিক হবে। সুতরাং বাজার সিন্ডিকেট দূর করা বা একে শুধুই স্মৃতি হিসেবে পরিণত করা আদৌ কতটুকু সম্ভব?
অপরদিকে সিলেট নগরের টিলাগড় মোড়ে ‘কৃষকের হাট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য কতগুলো নতুন পদক্ষেপ যুক্ত করতে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই হঠাৎ একেকটা কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিকভাবে মূল্যবৃদ্ধি হয়। এসব কৃষিপণ্য এবং যেসব প্রয়োজনীয় পণ্য আমরা আমদানি করি, সেগুলোর বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সারা বছর মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার জন্য, কতগুলো উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। এর মধ্যে এটি (কৃষকের হাট) একটি। মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের যেসব জায়গায় যে কৃষিপণ্য হয়, আমাদের সেসব জায়গার জেলা ও উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেবে। যাতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলো, সপ্তাহে এক বা দুই দিন বাজারগুলোতে নিয়ে আসেন। স্থানীয় প্রশাসন যেসব জায়গায় ঠিক করবেন চাহিদা অনুযায়ী, সেসব জায়গায় তাদের পণ্যগুলো নিয়ে যাবেন। এতে অপ্রত্যাশিত খরচ যোগ হবে না। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে। হঠাৎ করে কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধি বা বাজার ম্যানিপুলেশন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাজার কারও ম্যানিপুলেশনের শিকার, কোনো সিন্ডিকেটের অধীনে বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় এই কথা, এই স্মৃতি বাংলাদেশ থেকে বিদায় দেব।’
উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দেশের প্রতিটি নাগরিক চায়, সিন্ডিকেট দূর হোক এবং ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি জাদুঘরে আবদ্ধ থাক। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি সিন্ডিকেট সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সিন্ডিকেট আছে, সিন্ডিকেটে হাত দেওয়া যাবে না।’ তার মতে, তারা অনেক বড়; এ কারণে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট তৈরি করে। যদি সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে তারা পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিতে পারে; ফলে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেবে এবং মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে। একজন মন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। সিন্ডিকেট কখনো সরকার বা রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হতে পারে না। বর্তমান সরকারকে অধিকতর সংযম, ধৈর্য ও দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে হবে। দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, এমন মন্তব্য থেকে প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বিরত থাকতে হবে। তবেই সংকটকালীন মুহূর্ত পার করা সম্ভব। সবাই দায়িত্বশীল হলে, ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট