অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতায় ঝুঁকি

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

কেরানীগঞ্জ থানার শুভাড্ডা ইউনিয়নের মুসলিম নগরে আমার বাসা। তার পাশে ইকুরিয়ার বাজার। গত ২৩ বছর ধরে এখান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করি। মাঝেমধ্যে মাছ কিনতে যাই, জুরাইন বাজারে। কিন্তু এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। তেলের মূল্যবৃদ্ধির দুদিনও পেরোয়নি, এর মধ্যেই বাজারের চিত্র বদলে গেছে। মাছের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। শুধু মাছ নয়, শাকসবজির দামও একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে এক মাছ বিক্রেতা মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাছের এত বেশি দাম কেন?’ তিনি কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনি জানেন না, তেলের দাম বাড়াইছে। গাড়ি ভাড়া বেশি, মাছের কেনা দামও বাড়ছে। কী করমু মামা?’ এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে, পুরো জনজীবনের অর্থনীতির বাস্তবতা। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যায়, আর সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে। সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও গভীর হবে। মাছ ধরার ট্রলারগুলো পুরোপুরি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এর দাম বাড়ার কারণে ট্রলারের খরচ বাড়ে, ফলে মাছের বাজারদরও বাড়তে বাধ্য। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে ট্রলারের ওপর নির্ভরশীল। নারিকেল, ডাব, কলা, সবজি, মাছ, মুরগি, এমনকি নার্সারির চারা-কলম ও কাঠ সবই ট্রলারে বাজারে আসে। ধান ও চালের ব্যবসাও এর বাইরে নয়। দেশের সেচ ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে যায়, ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পণ্য পরিবহনের বাড়তি ভাড়া। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য নিয়ে যেতে বেশি খরচ হওয়ায়, শেষ পর্যন্ত বাজারে সেই পণ্যের দামও বেড়ে যায়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে, প্রায় সব ধরনের ভোগ্য ও ব্যবহৃত পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। সাধারণ মানুষকে সেই বাড়তি মূল্য দিয়েই পণ্য কিনতে হয়, কারণ বিকল্প কোনো পথ সরকার খোলা রাখেনি।

ব্যাংকার বন্ধু আকাশ গতকাল ঢাকায় এসেছে। তার বাড়ি নড়াইলে। সে বলল, ‘বাসভাড়া আগের চেয়ে দেড়শ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। কারণ তেলের দাম বেড়েছে।’ জ্বালানি তেলের দাম বাড়া মানে, সমগ্র জীবনব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধি যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ¦ালানি তেলের দাম সমন্বয়ের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে সাধারণ গণমানুষের জন্য অসহনীয় চাপের বোঝা। ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন দামে অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন ও ডিজেলের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রতিলিটার ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা এবং ডিজেল ১১৫ টাকা করা হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, সেখানে এক লাফে ১৫ টাকা বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার বেড়ে যাবে। একইভাবে পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রায় ২০ টাকার কাছাকাছি বৃদ্ধি পাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির জন্য, একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দেবে। জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাংলাদেশে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার অর্থ হচ্ছে, বাস-ট্রাক-লঞ্চসহ সব ধরনের পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বর্তায়, কারণ পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি হয়, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। এ ছাড়া, শিল্প খাতে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে। অনেক শিল্পকারখানা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জ¦ালানির ওপর নির্ভরশীল।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার, কারখানার যন্ত্রপাতি চালানো এবং পণ্য পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত খরচ, শিল্পপতিদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে, যার প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয়।  সরকার এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যে যুক্তি দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা এবং ভর্তুকির চাপ কমানো। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসার ফলে সরকারের বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। তাই মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে, সেই চাপ কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই নীতির বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই সমন্বয়ের ভার কে বহন করবে? বাস্তবে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত এর বড় অংশ সাধারণ জনগণের ওপর পড়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বছরের শুরুতে সরকার জজ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার দাম বাড়ানোর এই প্রবণতা একটি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে। এই ওঠানামা ব্যবসায়ী ও ভোক্তা, উভয়ের জন্য পরিকল্পনা করা কঠিন করে তোলে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষরা, এই ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেশি সমস্যায় পড়ে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানির দাম বাড়লে, তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন খরচ বাড়ার ফলে পণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়, কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর সেই অতিরিক্ত চাপ গিয়ে পড়ে। কিন্তু এই ব্যয়ের বিপরীতে জনগণের আয়ের কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। শ্রমিকের পারিশ্রমিক বাড়ে না, চাকরিজীবীদের বেতনও একই থাকে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান বৈষম্য তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তোলে। এই অসম ভারসাম্য একসময় সমাজে গভীর চাপ সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা এবং চাপ বৃদ্ধি পায়। এই সামাজিক চাপ একসময় রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর প্রভাব ফেলে এবং তা সরাসরি সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই জনমনে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জনগণ জানে আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বেড়েছে। তবুও তাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বাস্তব চাপ তৈরি হয়, তার প্রতিফলন তারা সরকারের ওপরই দেখে। দাম বাড়ার ঘোষণার পরে গত দুদিনে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলোতে সরবরাহ সংকট, দীর্ঘ লাইন এবং অচলাবস্থা তৈরি হতে দেখা যায়। মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে পাম্প বন্ধ থাকা এবং শত শত যানবাহনের অপেক্ষা প্রমাণ করে, বাজারে শুধু দাম সমন্বয় যথেষ্ট নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। চালকদের রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা আধা কিলোমিটার দীর্ঘ সারি গড়ে ওঠা মূলত ‘সংকটের আশঙ্কা’ থেকে সৃষ্ট আচরণ। মানুষ যখন মনে করে পণ্য সংকট হতে পারে, তখন তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সংগ্রহ করতে চায়, যা আবার কৃত্রিম সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। অন্যদিকে, পাম্পে তেল থাকলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও সীমিত সরবরাহের অভিযোগ দেখায় যে, সরবরাহ চেইনে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। গ্রাহকদের অসন্তোষ বাড়ায়। কারণ তারা প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না, অথচ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে সরকারের মূল্য সমন্বয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গ্রাহকরা মনে করেন, ‘দাম বাড়িয়ে লাভ কী, যদি তেলই না পাওয়া যায়?’ অনেকেই মনে করছেন, দাম বাড়ার ফলে মজুদদার বা কালোবাজারিদের সুযোগ কমে যাবে। আগে কম দামে তেল কিনে বেশি দামে বিক্রির যে প্রবণতা ছিল, তা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। জ্বালানি বাজারে শুধু মূল্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়, বরং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার তদারকি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ আমাদের সামনে যে বাস্তবতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, তা হলো জ্বালানি তেলের ওপর আধুনিক সভ্যতার গভীর নির্ভরশীলতা। আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে বৈশি^ক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে এবং তার ঢেউ কত দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনে এসে আঘাত হানে এই ঘটনাপ্রবাহ তার বাস্তব উদাহরণ। যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলে তার প্রভাব আমাদের রান্নাঘর, যাতায়াত, কৃষিকাজ এবং বাজারদরের ওপর সরাসরি পড়ে। তেল শুধু একটি পণ্য নয়, এটি অর্থনীতির চালিকাশক্তি। পরিবহনব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, কৃষি কার্যক্রম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানি তেলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে তেলের দামের সামান্য ওঠানামাও এক ধরনের শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা ধাপে ধাপে প্রতিটি খাতে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমরা বুঝতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা একটি দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যখন বৈশ্বিক কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন আমদানিনির্ভর দেশগুলো দ্রুত মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকে বহন করতে হয়। যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কীভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজন বিকল্প জ্বালানির উৎস খোঁজা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে টেকসই নীতি দরকার। যা ভবিষ্যতে এই ধরনের বৈশি^ক ধাক্কা থেকে জনজীবনকে সুরক্ষা দিতে পারে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত