ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও, এখন পর্যন্ত কোনো শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে পারেনি দুই দেশ। এরই মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে শান্তি আলোচনার মন্থর গতি, উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকিতে ফেলেছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের বারংবার যুদ্ধের হুমকি সে শঙ্কা আরও বাড়াচ্ছে। তবে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ালে গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দেওয়ার ‘নিকট-মেয়াদি ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এ তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনার স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সাত সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’-এর অন্তত ৪৫ শতাংশ, ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংসকারী ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ধেক এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৫০ শতাংশ খরচ করে ফেলেছে। সিএসআইএসের এ নতুন বিশ্লেষণ পেন্টাগনের গোপন তথ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু চুক্তি সই করলেও এ সিস্টেমগুলো প্রতিস্থাপন করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে বর্তমানে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যদি ভেঙে যায়, তবে স্বল্প মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো বোমা ও মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কিংবা চীনের মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ সমরসম্ভার প্রয়োজন, তা এখন আর নেই। এই ভাণ্ডার পূর্ণ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। সিএসআইএস প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান সিএনএনকে বলেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের দুর্বলতা বেড়ে গেছে। এ ঘাটতি পূরণ করতে ১-৪ বছর এবং প্রয়োজনীয় সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এ আশঙ্কা নাকচ করে এক বিবৃতিতে সিএনএনকে বলেন প্রেসিডেন্ট যখন এবং যেখানে চাইবেন, সেখানেই অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা আমাদের বাহিনীর রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে আমরা বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করছি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার নিশ্চিত করেছি। সিএসআইএস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের ‘টমাহক’ মিসাইলের ৩০ শতাংশ, ‘জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ’ মিসাইলের ২০ শতাংশ এবং এসএস-৩ ও এসএস-৬ মিসাইলের ২০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। এসব অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র পুনরায় তৈরি করতে ৪-৫ বছর সময় লাগতে পারে।
অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার এই ‘মিসাইল অঙ্ক’ বা গাণিতিক হিসাবটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমরাস্ত্রের ঘাটতি নেই, যদিও তিনি এ যুদ্ধের কারণেই পেন্টাগনের জন্য বাড়তি তহবিল চেয়েছিলেন। ট্রাম্প গত মাসে বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক কারণে বাড়তি তহবিল চাইছি। উচ্চপর্যায়ের প্রচুর রসদ আমাদের আছে, কিন্তু আমরা তা সংরক্ষণ করছি। শীর্ষে থাকতে আমাদের এই ছোট দামটুকু (খরচ) দিতেই হবে।’
যুদ্ধের শুরুতেই জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং অন্যান্য সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলবে। সিনেটর মার্ক কেলিও গত মাসে একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ইরানিদের কাছে প্রচুর পরিমাণ শাহেদ ড্রোন এবং মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার মিসাইল রয়েছে। একটি পর্যায়ে গিয়ে এটি গাণিতিক সমস্যায় পরিণত হবে যে, আমরা আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কোথা থেকে এবং কীভাবে পুনরায় সরবরাহ করব। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদ ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বা একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।