অহংকার মানুষের ভয়াবহ এক অসুখ। এটি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয় এবং তাকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতে প্ররোচিত করে। অথচ মানুষের প্রতিটি নেয়ামত ও সাফল্য আল্লাহর দান। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহংকারী।’ (সুরা নিসা ৩৬) এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অহংকার শুধু একটি নৈতিক ত্রুটি নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় একটি গুণ।
অহংকারের বিপরীতে বিনয় সেই মহৎ গুণ, যা মানুষকে সত্যের প্রতি অবনত হতে শেখায়। একজন বিনয়ী ব্যক্তি জানে, তার জ্ঞান, সম্পদ কিংবা মর্যাদা সবই আল্লাহর দান। তাই সে গর্বিত না হয়ে কৃতজ্ঞ হয় এবং অন্যদের সঙ্গে আচরণে নম্রতা প্রদর্শন করে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’ (সুরা ফুরকান ৬৩) এই নম্রতাই একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য।
অহংকারে পতন হয়েছে, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইবলিস, যে আদম (আ.)-কে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল তার অহংকারের কারণে। সে বলেছিল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম, আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি দিয়ে।’ (সুরা আরাফ ১২) এই অহংকারই তাকে মহান আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বঞ্চিত করে। এর বিপরীতে নবী-রাসুলগণ ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত মর্যাদা অহংকারে নয়, বরং বিনয়ে নিহিত।
বর্তমান যুগে অহংকারের রূপ আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রচার ও অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করার যে সংস্কৃতি আমরা দেখছি, তা মূলত অহংকারেরই আধুনিক প্রতিফলন। এর ফলে হৃদ্যতার বদলে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস ও অসম প্রতিযোগিতা। অথচ বিনয় মানুষকে কাছাকাছি আনে এবং গড়ে তোলে সহমর্মিতার সেতুবন্ধন।
একজন মুমিনের জন্য বিনয় মানে নিজেকে ছোট করা নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা। এটি এমন এক ভারসাম্য, যেখানে আত্মমর্যাদা অটুট থাকে, কিন্তু অন্যকে ছোট করার প্রবৃত্তি থাকে না। অহংকার থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো নিয়মিত আত্মসমালোচনা, ভুল স্বীকার, মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কৃতজ্ঞতা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তার প্রতিটি অর্জনই মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল।
অহংকার থেকে বাঁচতে হতে হলে একজন মুমিনকে সচেতনভাবে বিনয়ের পথই বেছে নিতে হবে। কারণ অহংকার মানুষকে পতনের দিকে নিয়ে যায়, আর বিনয় তাকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। যে হৃদয়ে বিনয় থাকে, সেখানেই বর্ষিত হয় মহান আল্লাহর রহমত। আর সেখানেই নিহিত থাকে প্রকৃত সফলতা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বিনয়ী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
