জীবনে স্বস্তি লাভের উপায়

মসজিদে নববির জুমার খুতবা

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

গত শুক্রবার মসজিদে নববির জুমার খুতবায় শায়খ ড. হুসাইন আলে শায়খ মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্থিব জীবনের অস্থিরতা কাটিয়ে পরম স্বস্তি পেতে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের বিকল্প নেই। নেক আমলই দুনিয়া ও আখেরাতে সুখের মূল চাবিকাঠি। হৃদয়ের প্রশান্তি কেবল আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও তার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। দুনিয়ার ভোগবিলাস ক্ষণস্থায়ী, তাই আল্লাহমুখী জীবনই প্রকৃত শান্তির দিশা দেয়।

হে মুসলমানগণ, আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে মহান আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। গোপনে ও প্রকাশ্যে তার আনুগত্য করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের আমলসমূহ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে, সে তো মহা সফলতা অর্জন করল।’ (সুরা আহজব৭০-৭১)

হে মুসলিম সমাজ! মানুষ জীবনের স্বস্তি এবং হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জনের জন্য সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করে। অথচ মহান আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, এগুলো কীভাবে অর্জিত হয়। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলরা থাকবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে এবং পাপাচারীরা থাকবে জাহান্নামে।’ (সুরা ইনফিতা ১৩-১৪)

গবেষক আলেমগণ এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, এই নেয়ামত ও শাস্তি কেবল আখেরাতের জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং দুনিয়া, কবরের জগৎ এবং চিরস্থায়ী আবাস, এই তিন জগতেই তা প্রযোজ্য। মূলত নেয়ামত হলো হৃদয়ের সুখ এবং আজাব হলো হৃদয়ের কষ্ট। আল্লাহর সান্নিধ্যের যে স্বাদ, তার তুলনা কোনো কিছুর সঙ্গে হয় না। বান্দার তার প্রতিপালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তার ইবাদত, তার জিকির, তার কিতাবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, এগুলো এমন এক নেয়ামত, যা দুনিয়ার সব ভোগবিলাস ও কামনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

হে আল্লাহর বান্দাগণ, হৃদয়ের প্রশান্তি কেবল তখনই আসে, যখন হৃদয় তার রবের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, একনিষ্ঠভাবে তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে, কথা ও কাজে তার আনুগত্যে আত্মসমর্পণ করে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তা অপেক্ষা অবশ্যই তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।’ (সুরা নাহল ৯৭)

হে মুসলিম ভাইয়েরা, চোখ তৃপ্ত হয় না, হৃদয় প্রশান্ত হয় না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিনয়, পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করা না হয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ ২৮)

তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তার কাছে ফিরে যাও, (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তার আনুগত্য অনুযায়ী দান করবেন।’ (সুরা হুদ ৩)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! হৃদয়ের প্রশান্তি, আনন্দ, উল্লাস, স্বাদ, প্রফুল্লতা, প্রশস্ততা ও আলোকিত হওয়া, এই সবকিছুই অর্জিত হয় কেবল সেই ঐশী পদ্ধতির মাধ্যমে, যার দিকে মহান আল্লাহ তার কিতাবে দিকনির্দেশ দিয়েছেন এবং তার রাসুল (সা.) তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এ পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই সব দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মূল কারণ এবং দুর্ভাগ্য ও লাঞ্ছনার উৎস। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য হবে সংকীর্ণ জীবন এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাব।’ (সুরা তাহা ১২৪)

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে সর্বদা দুঃখ-কষ্ট ও গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে। কারণ সে এই দুনিয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে বাঁচে, যা নানা কষ্ট, সংকট ও বিপদ দ্বারা পরিবেষ্টিত। যদিও সে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জন করে, তবুও তার এই অবস্থা পরিবর্তিত হয় না। কারণ দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য স্থায়ী নয় এবং এর নিরাপত্তাও চিরস্থায়ী নয়। কবরের জীবন ও আখেরাতের জীবনে তার যে কষ্ট হবে, তা কত ভয়াবহ! আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি ব্যর্থতা থেকে।

হে মুসলিম ভাইয়েরা! নামাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এমন এক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা অন্তরকে দুনিয়ার সব ক্লান্তি ও ব্যস্ততা থেকে মুক্তি দেয়। তখন বান্দার অন্তর মহান আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং সে তার সান্নিধ্যে প্রশান্তি লাভ করে। ফলে সে এমন এক আনন্দ লাভ করে, যা সব আনন্দের ঊর্ধ্বে এবং যার সঙ্গে দুনিয়ার কোনো আনন্দের তুলনা হয় না। এটি হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ, যা দুনিয়ার জান্নাত, চোখের শীতলতা, আত্মার প্রশান্তি এবং অন্তরের আনন্দ।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে নামাজে।’ (মুসনাদ আহমদ) আপনারা আপনাদের রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করুন, তার নৈকট্য অর্জন করুন। তাহলে আপনারা দুনিয়া ও আখেরাতে মহাসফলতা অর্জন করতে পারবেন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! অন্তরের দুশ্চিন্তা এবং হৃদয়ের কষ্ট দূর করার উপায় হলো মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং তার সন্তুষ্টিকে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দেওয়া। এর সবচেয়ে বড় উপায় হলো আল্লাহর প্রতি তাওহিদের দৃঢ়তা, তার ওপর পূর্ণ ভরসা, তার পরিচয় লাভ, তার গুণাবলি ও সুন্দর নামসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, তার প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং তার সৃষ্টির প্রতি সবসময় সদাচরণ করা।

যে ব্যক্তি এভাবে জীবনযাপন করে সে সুখ, আনন্দ ও প্রফুল্লতা অর্জন করে। মহান আল্লাহ তাকে দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করেন এবং তার কষ্ট দূর করে দেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন।’ (সুরা তালাক ২)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আনন্দ ও প্রশান্তি অর্জন এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করার অন্যতম উপায় হলো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।

হে আল্লাহ! জীবিত ও মৃত সকল মুমিন পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, মুসলমানদের থেকে ফেতনা দূর করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদের সবাইকে আপনার হেফাজতে রাখুন। তাদের দুশ্চিন্তা দূর করুন, তাদের কষ্ট দূর করুন, তাদের বিপদ দূর করুন।

হে আল্লাহ! মুসলমানদের শত্রুদের ধ্বংস করুন। আমরা তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে মহামহিম, হে সম্মানিত, আপনি আমাদের জন্য যথেষ্ট, আপনি উত্তম কর্মবিধায়ক। সব মুসলমানের জন্য আপনি অভিভাবক, সাহায্যকারী, রক্ষক ও সহায়ক হয়ে যান।

হে আল্লাহ! মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রক্ষা করুন। মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র, কুটচাল এবং আক্রমণকারীদের আক্রমণ প্রতিহত করুন।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! আমাদেরকে কঠিন বিপদ, দুর্ভাগ্য, খারাপ পরিণতি এবং শত্রুর বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করুন। আমাদেরকে আপনার নেয়ামত হারিয়ে যাওয়া থেকে, সুস্থতা পরিবর্তিত হওয়া থেকে, হঠাৎ শাস্তি নেমে আসা থেকে এবং আপনার সকল অসন্তোষ থেকে রক্ষা করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের সাহায্য করুন। মুসলিম দেশগুলোতে কল্যাণকর বৃষ্টি দান করুন এবং তাদের অন্তরসমূহকে এমন কিছু দিয়ে সিক্ত করুন, যা তাদের আনন্দ ও সুখ দান করে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা মহান আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন এবং সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ঘোষণা করুন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির প্রতিপালক।

১৭ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত