ঢাকা বিমানবন্দরের কাছের দেয়ালগুলো দূর দেশের আকাশ ধরে রাখলেও মানুষের কান্না ধরে রাখতে পারে না। সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি; যেন ভোর তার কপালে ছাই মেখে বসে আছে। আগত যাত্রীদের আসা-যাওয়ায় দরজা খোলে আর বন্ধ হয়। ট্রলির চাকায় ধাতব শব্দ ওঠে। কোথাও কফির গন্ধ, কোথাও ভাঙা ইংরেজিতে ঘোষণা, কোথাও পুলিশের হাঁকডাক। এসব শব্দের মাঝেই ঝিনাইদহ জেলার মান্দারতলা গ্রাম থেকে আসা চারজন মানুষ বসে আছে এমনভাবে যেন তারা বিমানবন্দরে নয়, কোনো অচেনা শ্মশানের চৌকাঠে।
একটা লাশ নিতে তারা এসেছে। মাইক্রোবাসটা পৌঁছেছে শেষ রাতে। গাড়ির গায়ে পথের ধুলো, ভেতরে মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সামনে ড্রাইভার মজনুর পাশে বসে আছেন একজন বাবা, নাম আব্দুল গনি। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। কিন্তু আজ তাকে আরও বুড়ো দেখাচ্ছে। মানুষের বয়স কখনো ক্যালেন্ডারে বাড়ে না; বাড়ে একটা ফোনকলেই। পেছনের সিটে নুয়ে বসে আছে ছোট ছেলে হেলাল, মৃতের আপন ছোট ভাই। আর তার পাশে বসে আছে মেয়েটি, নাম সাথী। মাত্র তিন মাস হলো তার বিয়ে হয়েছে। মেহেদির রঙ হাত থেকে উঠে গেলেও সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, পৃথিবী এত দ্রুত রঙ বদলায়।
মৃত মানুষটির নাম রফিকুল ইসলাম। বয়স ছাব্বিশ। মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে ভবন নির্মাণের কাজ করত। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কাচের শহর যারা তোলে, তাদের ঘরগুলো সাধারণত টিনের বা মাটির হয়। রফিকুলও তেমনই ছিল। নিজের হাতে অন্যের প্রাসাদ বানাত, আর স্বপ্ন দেখত নিজের বাড়িতে একটা পাকা ঘর তুলবে। সাথীকে বলেছিল, ‘তোর জন্য একটা বড় জানালা রাখব। সকালে রোদ ঢুকবে।’
সাথী তখন হেসেছিল। নববধূর হাসি যেমন হয়—নরম, একটু লজ্জায় ভরা, ভবিষ্যতের প্রতি এক অদ্ভুত বিশ্বাসে ভেজা। তারা কেউ জানত না, জানালা দিয়ে শুধু রোদ নয়, কখনো কখনো শোকও ঢুকে পড়ে।
ফাল্গুনে তাদের বিয়ে হয়েছিল। সেদিন গ্রামজুড়ে ছিল কোকিলের ডাক, ভাতের হাঁড়ির ধোঁয়া, আর রাতের উঠোনে চাঁদের আলো। রফিকুল ছুটি নিয়ে এসেছিল মাত্র কুড়ি দিনের জন্য। তবু সেই কুড়ি দিনকে তারা এমনভাবে বাঁচিয়েছিল, যেন মানুষের জীবনে সময় নয়, ঘনত্বই আসল। রাতের পর রাত কথা হয়েছে—সংসারের হিসাব, গরু কেনা, বাবার ওষুধ, ভাইয়ের পড়াশোনা। আবার কোনো কারণ ছাড়াই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা।
ভালোবাসা কখনো উঁচু গলায় কথা বলে না; সে থাকে নিশ্বাসের ভেতর, চুপচাপ।
ফিরে যাওয়ার আগের রাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে রফিকুল বলেছিল, ‘এইবার টাকা কামাই করে আসি। পরে আর এত কষ্টের কাজ করব না।’
তার বাবা বিড়ি ধরাতে ধরাতে বলেছিলেন, ‘মানুষের কপাল যদি ইটের মতো হতো, হাতুড়ি দিয়ে নিজের মতো গড়তে পারতাম।’
রফিকুল হেসে বলেছিল, ‘আমার কপাল খারাপ না, আব্বা। বিদেশে থাকি, টাকা পাঠাতে পারি, আবার মাঝে মাঝে দেশেও আসি।’
সেই ‘আবার’ শব্দটার ভেতর কী এক শান্তি ছিল। এখন মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম হয়তো এই শব্দটাই।
একদিন দুপুরে ফোন এলো। গ্রামে তখন রোদ ঝিমিয়ে পড়ছে। হেলাল বাড়িতে ঢুকেই দেখে উঠোনে অনেক মানুষ। কারও মুখে কথা নেই। বাবা মাটিতে বসে আছেন। সাথী দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে, মুখে কোনো শব্দ নেই। কান্না তখনো জন্মায়নি। শুধু কেউ একজন কাঁপা গলায় বলল, ‘ফোন আসছে, হামলা হইছে রফিক নাই।’
‘নাই’ শব্দটা বাংলায় বড় নিষ্ঠুর। এটা শুধু একজন মানুষকে নেয় না, পুরো একটা বাড়িকে খালি করে দেয়।
কয়েক দিন ধরেই যুদ্ধের খবর শোনা যাচ্ছিল। বড় বড় রাষ্ট্রের আকাশে আগুন উঠেছে। আর সেই আগুনের ছাই এসে পড়েছে শ্রমিকদের বাসস্থানে। যে নির্মাণাধীন ভবনে রফিকুল কাজ করত, বিস্ফোরণের অভিঘাতে কংক্রিট ভেঙে পড়ে। সে নাকি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। মানুষ সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই হয়তো এমন কথা বলে। কিন্তু মৃত্যু যদি এক মুহূর্তেরও হয়, তার পরে যে অনন্ত সময় রেখে যায়, সেটা তো জীবিতদেরই বইতে হয়।
বিমানবন্দরে বসে সাথী কাচের ওপাশে মানুষজন দেখে। কেউ ফিরে আসছে চাকরি শেষে, কেউ যাচ্ছে নতুন স্বপ্ন নিয়ে, কেউ বাচ্চার হাত ধরে হাসছে। পৃথিবী এমনই। কারও শোকের পাশে কারও স্বাভাবিক জীবন অনায়াসে হাঁটে। তার মনে হয়, এই স্বাভাবিকতাই সবচেয়ে আশ্চর্য। তার কপাল ভেঙেছে, তবু স্ক্রিনে ফ্লাইট নম্বর উঠছে, ঘোষণায় বলা হচ্ছে কোন ফ্লাইটের ব্যাগেজ কোন বেল্টে যাবে।
আব্দুল গনি হঠাৎ বললেন, ‘তোর ভাই ছোটবেলায় কেমন দৌড়াত মনে আছে?’
হেলাল চুপচাপ মাথা নাড়ে।
কিছুক্ষণ পরে বৃদ্ধ মানুষটি নিজের সঙ্গেই যেন বললেন, ‘বাচ্চাদের মানুষ করি ক্যান?’
যাতে বড় হলে যুদ্ধ এসে তাকে মারে?’
কেউ উত্তর দিল না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই, কোনো রাষ্ট্রদূতের কাছে নেই। যুদ্ধের সব ভাষণে জিতে যায় বন্দুক, আর হেরে যায় বাবারা।
সাথীর মনে পড়ে—বিয়ের পরের দিন ভোরে রফিকুল উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছিল। কুয়াশার মধ্যে তার শরীরের ওপর আলো পড়ছিল। সাথী চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। সে হঠাৎ পেছন ফিরে বলে উঠেছিল, ‘এই, এত লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিস ক্যান?’
সাথী লজ্জা পেয়ে ভেতরে চলে গিয়েছিল।
আজ সেই একই কুয়াশা মনে পড়ে, কিন্তু মানুষটা আর নেই। স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর কারিগর। যা ভেঙে যায়, তাই সবচেয়ে যত্ন করে ধরে রাখে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। এক কর্মকর্তা এসে কাগজে সই নিয়ে যায়। তার ব্যবহার অমায়িক, কিন্তু অভ্যস্ত। মনে হয় এমন কাজ তিনি আগেও করেছেন। সাথীর হঠাৎ রাগ হয়। মানুষটা দোষী নয়, তবু। শোকের একটা স্বভাব আছে যে, সে অপরাধীর মুখ না পেলে নিরপরাধীর দিকেও তির ছোড়ে।
যুদ্ধও তেমন। যারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা নিরাপদ কক্ষে বসে মানচিত্র দেখে, আর যারা মরে তারা নকশার বাইরে থাকা মানুষ।
অবশেষে খবর আসে যে লাশ এসেছে। শব্দটা উচ্চারণ হতেই সাথী মাথা নিচু করে। সে আজও স্বামীর নামের পাশে এই শব্দ বসাতে পারে না।
কফিন যখন আনা হলো, চারপাশের শব্দ যেন আচমকা দূরে সরে গেল। আব্দুল গনি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টলে পড়লেন। হেলাল তাকে ধরল। সাথী প্রথমে এগোয়নি। যেন সামনে এগোলেই সব সত্যি হয়ে যাবে। পরে ধীরে ধীরে গেল। কাঠের বক্সের গায়ে সাদা কাগজে নাম, নম্বর, দেশের কোড। এই কি মানুষের চূড়ান্ত পরিচয়?
সে হাত রাখল কফিনের ওপর। ঠান্ডা, নির্বাক। তার ভেতরে শুধু একটাই বাক্য বাজতে থাকে—‘তুমি তো জানালা বানাতে গিয়েছিলে, কফিন হয়ে ফিরলে কেন?’
হেলাল দাঁতে দাঁত চেপে আছে। তার মনে পড়ছে—ভাই বলেছিল, ‘আমি আছি না?’ এখন সে ভাবছে, মানুষ কাকে বলে ‘আছি’? যে দূর দেশ থেকে টাকা পাঠায়, না কি যে শেষ পর্যন্ত কাঁধে ওজন হয়ে ফিরে আসে?
আব্দুল গনি কফিনের দিকে তাকিয়ে বিলাপ করতে করতে বললেন, ‘তোরা বড় দেশ, ছোট দেশ, ধর্ম, প্রতিশোধ অনেক কিছু জানিস। কেউ কি আমার ছেলের নাম জানত? কেউ কি জানত, ওর বউয়ের বয়স কত? কেউ কি জানত ও বাড়ি এসে আমগাছের পাশে একটা ঘর তুলতে চায়?’
তার গলা ধরে আসে—‘মানচিত্রে বোমা ফালাইছিস, ঠিক আছে। কিন্তু বোমা তো মানুষের নামের ওপরই পড়ে।’
মাইক্রোবাসে কফিন তোলা হলো। যেভাবে মানুষ বাজার থেকে জিনিস তোলে, সেভাবে নয়। যেভাবে বুকের ভেতর কাঁটা নিয়ে হাঁটা হয়, সেভাবে। সূর্যের আলো কফিনের ওপর ফোঁটা ফোঁটা পড়ে। সাথীর মনে হয় মানুষের জীবনও কি এমন? একটু আলো, অনেক কাঠ, আর মাঝখানে নাম-লেখা এক টুকরো কাগজ?
পরক্ষণেই সে নিজেকে শুধরে নেয়। না, রফিকুল শুধু কাগজ ছিল না। সে ছিল মাঠের ধারে দাঁড়ানো এক তরুণ, ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, ছিল প্রতিদিন রাতে ফোনে বলা একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি।
যুদ্ধ মানুষকে মারে, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর যে, মানুষকে সংখ্যা বানায়। দশ জন, একশো জন, হাজার জন। অথচ প্রতিটি মৃত মানুষের পেছনে থাকে একটি উঠোন, একটি থালা, একটি অসমাপ্ত বাক্য, একটি অপেক্ষমাণ জানালা।
ফেরার পথে সাথী কফিনের ওপর হাত রেখে খুব নিচু গলায় বলল, ‘আমি জানালাটা বানাব।’
এই বাক্য বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে প্রথম জল এলো। এই জল শুধু শোকের নয়, এ প্রতিজ্ঞারও। যুদ্ধ যা ভাঙে, মানুষ তার মধ্যেও ছোট্ট করে নির্মাণের স্বপ্ন দেখে।
মাইক্রোবাস গ্রামে ঢোকে। ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুর—সব যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ছেলে ফিরছে, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে নয়। পৃথিবীর কাছে সে বিদেশফেরত শ্রমিক; নিজের গ্রামের কাছে সে নিভে যাওয়া প্রদীপ, যার ধোঁয়া অনেক দিন উঠোনে লেগে থাকবে।
যুদ্ধ দূরে বসে নতুন যুক্তি খোঁজে, নতুন শত্রু বানায়, নতুন আকাশে আগুন তোলে। কিন্তু মান্দারতলার এই উঠোনে মানুষ জেনে যায়, যুদ্ধের কোনো বিজয় নেই। আছে শুধু নিঃসঙ্গ জানালা, পিতার ভাঙা পিঠ, ভাইয়ের স্তব্ধতা, আর এক নববধূর কাঁপা হাত—যে শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে বলতে শেখে, যুদ্ধ আর না।