এক মাসে ‎২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘ফ্লাড শেল্টারে’ ফাটল

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ফ্লাড শেল্টার ভবন হস্তান্তরের এক মাস না পেরোতেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শেল্টারের একাধিক স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়ায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এতে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (‎এলজিইডি) জানায়, বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শেল্টার নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পায় রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহিতি অ্যান্ড জেডএইচডি (জেবি) এন্টারপ্রাইজ। কাজটির বাস্তবায়ন করে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজ। ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ১৯ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শেষ করা হয়। পরে চলতি মাসের ৮ তারিখে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।

‎এলজিইডির প্রভাতি প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬২ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু হস্তান্তরের এক মাস না পেরোতেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নির্মাণ কাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, ভবনটিতে ওঠানামার জন্য দুটি সিঁড়ি রয়েছে-একটি রেলিং সিঁড়ি এবং অন্যটি সাধারণ সিঁড়ি। রেলিং সিঁড়িটি নিচ থেকে সরাসরি তৃতীয় তলায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা পাঠদানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং নিচতলা বন্যাকালে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের কথা রয়েছে। তবে রেলিং সিঁড়িতে অসংখ্য ফাটল দেখা গেছে। ভবনের পলেস্তারা ফেটে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। পানির ট্যাংকিতেও বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে। এই ফাটলের কারণে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সুইচবোর্ডের কিছু স্থান ফাঁকা থাকায় অসাবধানতাবশত কেউ স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে রেলিং সিঁড়ির কাঁচি গেট বন্ধ রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন হস্তান্তরের আগেই এসব ফাটল দেখা দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদার ও এলজিইডি কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হলেও তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২৪৯ জন শিক্ষার্থী পাঠদান করছে। তাদের নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

‎স্থানীয়রা জানায়, এটি শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, বন্যার সময় এ অঞ্চলের শত শত মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারের কথা। দীর্ঘদিনের দাবির পর আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মাণ হলেও এখন এর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

‎রামডাকুয়া গ্রামের বাসিন্দা ৪৫ বছরের মো. রমজান আলী বলেন, আমার সন্তান এই স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। একদিন তাকে নিয়ে রেলিং সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখি সিঁড়িতে ফাটল। পরে জানতে পারি নিরাপত্তার কারণে সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন বাচ্চাদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি।

‎বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা বৃদ্ধ মো. খলিলুর রহমান বলেন, বিল্ডিং করার তিন মাসও হয় নাই, এরই মধ্যে ফাটল ধরছে। আরও সময় গেলে কী হবে, তা নিয়ে ভয় লাগছে। বাচ্চারা স্কুলে থাকা পর্যন্ত আমাদের মনে সবসময় দুশ্চিন্তা কাজ করে।

‎তার অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলাকালে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

‎বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তফসিরা চৌধুরী বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসে ভবনটি হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আমরা ভবনে ওঠার আগ থেকেই এসব ফাটল ছিল। তাই ঝুঁকিপূর্ণ রেলিং সিঁড়িটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হলেও তারা শুধু আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

‎বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা মো. ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ বলেন, বিল্ডিংয়ে ফাটলের বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। তবে নির্মাণকাজ চলাকালে কয়েকবার গিয়ে অনিয়ম দেখেছি এবং এলজিইডি অফিসে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।

‎এ বিষয়ে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী প্রিতম জানান, ভবনের ফাটলের বিষয়ে যা বলা হচ্ছে সেটি সঠিক নয়। মূলত দুটো সিঁড়ির পিলারের কিছু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। বিষয়টি সমাধান করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তীর মুঠোফোনে  বার বার  যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভি করেননি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই বিষয় কথা কলতে নির্বাহী প্রকৌশলীকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তাকেও পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত