উষ্ণতম মাসে বৃষ্টির অপেক্ষা

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১২ এএম

দেশের উষ্ণতম মাস এপ্রিল। এ মাসে গরম বেশি অনুুভূত হয়। তাপমাত্রার পারদও থাকে ঊর্ধ্বমুখী। তাপমাত্রা অতীতের রেকর্ড না ছুঁলেও বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকায় অস্বস্তিকর গরম কিন্তু রয়েছে। এই গরমকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। মানুষ অপেক্ষায় আছে কবে বৃষ্টি হবে। এখন পর্যন্ত এপ্রিল মাসের তাপমাত্রার রেকর্ডে সর্বোচ্চ অবস্থান দখল করে আছে ১৯৬৪ সালের ১৫ এপ্রিল। ওই দিন যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পারদ উঠেছিল ৪৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পরবর্তী সময় ১৯৮৯ সালের ২১ এপ্রিল বগুড়ায় ৪৪ ডিগ্রি এবং নিকট-অতীতে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল যশোরে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠেছিল। অন্যদিকে চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত এপ্রিলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, গত ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে তা রেকর্ড করা হয়। গতকাল শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপামাত্রা ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসও রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীতে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে এপ্রিল মাসে কেন এত বেশি তাপমাত্রা অনুুভব হয়? জলবায়ুগত উপাত্ত অনুসারে দেশের উষ্ণতম মাস এপ্রিল। এই মাসের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু স্থানভেদে গড় তাপমাত্রার মধ্যেও পার্থক্য হয়ে থাকে। এপ্রিলে স্বাভাবিকভাবেই গরম বেশি পড়ে জানিয়ে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছরের এ সময়ে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পের আগমন কম ঘটে। আর এ কারণে দেশে বৃষ্টিপাত হয় না। এতে স্বাভাবিকভাবেই গরম বেশি অনুভূত হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে দেশে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে একটানা ৩২ দিন, ২০২৩ সালে ২৫ দিন তাপপ্রবাহ হলেও ২০২৫ সালে তাপপ্রবাহের হার কম ছিল। আবার চলতি বছরও তুলনামূলকভাবে তাপপ্রবাহ দীর্ঘায়িত হয়নি। মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি তাপপ্রবাহের পর এ পর্যন্ত দুই থেকে তিন দিন স্পেলের তিনটি তাপপ্রবাহ হয়েছে। যদিও এখনো একটি তাপপ্রবাহ হয়েছে। তারপরও একদিন মাত্র সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করলেও অন্য দিনগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাঝারি তাপপ্রবাহ (৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বয়ে গেছে। তাপমাত্রার এই পার্থক্য কেন?

কোনো বছর এপ্রিলে বেশি আবার কোনো বছর কম তাপমাত্রা অনুভবের পেছনে অন্যতম ফ্যাক্টর বজ্রঝড় এই মন্তব্য আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকারের। তিনি বলেন, বজ্রঝড় যদি বেশি হয়, তাহলে তাপমাত্রার পারদ কিছুটা কমে আসে। চলতি বছর ২০২৪ সালের তুলনায় বজ্রঝড় মার্চ মাস থেকেই শুরু হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে। আর এতেই চলতি বছর তাপমাত্রার পারদ এখনো ৪০ ডিগ্রি অতিক্রম করেনি। আগামীতেও আর বেশি বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, দক্ষিণ দিক থেকে আসা সাগরের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসের মিলিত প্রবাহে কালবৈশাখীর সৃষ্টি। আর কালবৈশাখীর প্রভাব বেশি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রার পারদ নেমে আসে। এবারও তাই ঘটছে।

 দেশে বজ্রঝড় নিয়ে গবেষণা করে রিজিওনাল ইন্ট্রিগেটেড মাল্টিহ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস)। কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির ওয়েদার এক্সপার্ট গোলাম রাব্বানির সঙ্গে। তিনি বলেন, এবার ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি বজ্রঝড় হয়েছে। আর বেশিরভাগ বজ্রঝড় হয়েছে দেশের সিলেট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী এলাকায়। বজ্রঝড় হলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা কমে আসে।

বজ্রঝড়ের কারণে তাপমাত্রা কমে আসার বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এপ্রিল মাসে গড়ে ৯ দিন বজ্রঝড় হওয়ার কথা। এ বছর ইতিমধ্যে তা হয়ে গেছে। বজ্রঝড় হলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। আর এ কারণে এবারের এপ্রিল অনেকটা স্বস্তিদায়ক যে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি। এমনকি ২০২৪ সালের মতো টানা তাপপ্রবাহও ছিল না।

চলতি মাসে তাপমাত্রার পারদ আর বাড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না মন্তব্য করে ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, আজ থেকে দেশের রংপুর ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর বৃষ্টিপাত হলে তাপমাত্রা কমে আসবে।

শুধু কি রংপুর ও সিলেটে বৃষ্টি হবে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোমবার থেকে রংপুর ও সিলেটের সঙ্গে ময়মনসিংহ এবং মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম বিভাগেও বৃষ্টি হবে। আর এতে সারা দেশের তাপমাত্রা কমে আসবে। এই বৃষ্টি থাকবে আগামী ৪ থেকে ৫ দিন।

এদিকে দেশের তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে তাপমাত্রার পারদ বেশি দেখা যায় যশোর, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ঈশ্বরদী, চুয়াডাঙ্গায়। দেশের বিগত ৫০ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডে দেখা যায়, এসব এলাকায় ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

আবহাওয়া ও ভূগোলবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের এ সময়ে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা বেশি থাকে। দেশের উষ্ণতম মাসও এপ্রিল। জুনের প্রথম সপ্তাহে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগ পর্যন্ত গরম অব্যাহত থাকবে। তবে মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে কালবৈশাখী কিংবা বৃষ্টি সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমালেও পরে আবার বেড়ে যাবে। আর এ সময়ের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে বলে গরমকে অস্বস্তিকর মনে হয়। এ ছাড়া দেশের নগরগুলোর পাশাপাশি সারা দেশেই ক্রমান্বয়ে মানুষের কর্মকা- বেড়েছে। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে প্রকৃতিতে। এতে স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হচ্ছে  বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা।

উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আর ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অতিতীব্র তাপপ্রবাহ হয়ে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত