অন্যদেরও গ্রেপ্তার চায় পরিবার

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১০ বছর পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী তনু হত্যা মামলায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান। সন্দেহভাজন এ আসামির গ্রেপ্তারে বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগা ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা আশার আলো দেখছেন।  এদিকে তনু হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হাফিজুর রহমানের তিন দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল  আদালতে হাজির করা হয়। ১৬৪ ধারায় তিনি জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল আমানের আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকার পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় হাফিজুর রহমান কিছু তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। এ কারণে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।’

এর আগে গত বুধবার কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ নম্বর আমলি আদালতে হাফিজুর রহমানের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকার কল্যাণপুরে পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরও দুই সাবেক সেনাসদস্যকে খোঁজা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।

বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার শুরু থেকেই তনুর পরিবারের অভিযোগ, মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। ভুক্তভোগী পরিবার প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দেখতে চায়।

কুমিল্লার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বলছেন, ‘অদৃশ্য চাপ’ শুরু থেকেই তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে এত বছরেও মামলার অগ্রগতি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাফিজুর রহমানের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সেই স্থবিরতা কাটার ইঙ্গিত মিলছে। এদিকে মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘কখনো আশা ছাড়িনি। আল্লাহর কাছে চেয়েছি, মরার আগে যেন বিচারটা দেখতে পারি। আমার মেয়ের খুনিদের ফাঁসি চাই।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের অভিযোগ, শুরু থেকেই তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতে চাইলেও তাকে তা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘১০ বছর ধরে শুধু একটাই প্রশ্ন বিচার হবে না? এখন মনে হচ্ছে, হয়তো সত্যিই বিচার পাব।’

পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন মহলও চান দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার নিশ্চিত হোক। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি কাইমুল হক ওরফে রিংকু বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান, এটা বাস্তবে প্রমাণ হওয়া দরকার।’

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, ‘এই মামলা আবারও অন্ধকারে হারিয়ে যাক, তা আমরা চাই না।’

প্রসঙ্গত ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন ঝোঁপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পর দিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। তবে দুই দফা ময়নাতদন্তেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে ডিবি ও সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। ২০২০ সালে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনএ পরীক্ষার ওপরই নির্ভর করছে এ মামলার অগ্রগতি। পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনায় তিনজন পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল। তবে সেগুলোর সঙ্গে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি। সম্প্রতি আদালতের অনুমতি নিয়ে তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ ক্রস-ম্যাচ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘সন্দেহভাজন একজন গ্রেপ্তার হয়েছে, অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’ আদালতের অনুমতি নিয়ে তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং নমুনা সংগ্রহের পর সেটি মেলানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এক দশকের প্রতীক্ষার পর তনু হত্যা মামলায় নতুন গতি এলেও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। সবার প্রত্যাশা এবার যেন সত্য উদ্ঘাটিত হয় এবং দোষীরা যেন পায় যথাযথ শাস্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত