নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। মিছিলের আগাম কোনো তথ্য পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। একদিকে মিছিলের গোয়েন্দা তথ্য যথাসময়ে না পাওয়া, অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কড়া বার্তা অস্বস্তিতে ফেলেছে নগর পুলিশকে। গত ২৪ এপ্রিল নগরের কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ থানার তিনটি পৃথক স্থানে ঝটিকা মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী। এসব ঘটনায় গতকাল রবিবার পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছেন সিএমপির মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর প্রথম সারির অনেক নেতা আত্মগোপন চলে যান। অনেকেই পাড়ি জমান বিদেশে। এরপর থেকে স্থবির হয়ে পড়ে সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন কৌশলের আভাস মিলছে। এ কৌশল একদিকে যেমন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, ঝটিকা মিছিলগুলো কি নিছক একটি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো রহস্য?
এদিকে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে পুলিশের দেওয়া এক চিঠিতে নড়েচড়ে বসেছে সরকারের উচ্চ পর্যায়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওই বিশেষ চিঠি পুলিশের সবকটি ইউনিটিতে পাঠানো হয়েছে। চিঠি পেয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। উগ্রবাদী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নোটে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিষয়টি ভাবাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও।
পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের দিকে মাঠে শক্তি প্রদর্শন শুরু করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠন। শুরুর দিকে ঝটিকা মিছিল হলেও এখন নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। প্রকাশ্যে তারা এসব কর্মসূচি চালাচ্ছে। যা নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মিছিলের আগাম তথ্য পেতে মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দারা ব্যর্থ হচ্ছেন কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে মহানগর ডিবি পুলিশের (দক্ষিণ) উপকমিশনার শেখ শরীফুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে সিএমপির মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
জানা গেছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের মাঠে দেখা না গেলেও অনেকেই এখন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে সক্রিয়। মিছিলের পেছনে টাকা ঢালছেন বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এমন আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করে সিএমপির মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের যেসব নেতাকর্মী ফেসবুকে সরব রয়েছেন তাদের বিষয়ে কাজ করছে পুলিশ। গত শুক্রবার সবাই যখন জুমার নামাজ পড়তে গেছেন তখন তারা নগরের পলোগ্রাউন্ড এলাকায় ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে মিছিল করে। খবর পেয়ে পুলিশ যাওয়ার আগেই তারা সটকে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, গত শুক্রবার সকালের ওই মিছিলটি বের করা হয় এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের ব্যানারে এবং সেটি মেডিকেল সেন্টার থেকে গোলপাহাড় এসে শেষ হয়। মিছিলের শুরু এবং শেষ দুটি পাঁচলাইশ থানার সীমানায়।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন রবিবার জানান, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল থেকে ১২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ (সংশোধনী ২০১৩) এর একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। পরে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এর আগে গেল শুক্রবার দুপুরে নগরের কয়েকটি এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলের পর পৃথক অভিযানে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে আত্মগোপনে থাকা নগর ছাত্রলীগ নেতাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ঝটিকা মিছিলের ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ছাত্রলীগের মিছিলে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আগামী দিনে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ঝটিকা মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তারা চট্টগ্রামে নাশকতার নানা পরিকল্পনাও করছে। ঝটিকা মিছিলের কৌশল নিয়ে নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, মিছিলে চট্টগ্রামের কয়েকজন নেতৃত্ব দিলেও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসছেন, যাতে তাদের সহজে শনাক্ত করা না যায়। এদিকে ঝটিকা মিছিল আটকাতে না পারার কারণ হিসেবে নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ফোর্স স্বল্পতাকে দায়ী করছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি।
