গত শুক্রবার মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় শায়খ ড. ওসামা ইবনে আবদুল্লাহ খাইয়াত সুন্দর আচরণকে সবচেয়ে দামি অলংকার আখ্যায়িত করে মুমিনদের মহান আল্লাহর সম্মানিত বিষয়গুলোর মর্যাদা রক্ষার তাগিদ দেন। বিশেষ করে, চারটি পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেন, এই সময় পাপ করলে সেটার ভয়াবহতা বেড়ে যায়, আবার নেক আমলের সওয়াবও বৃদ্ধি পায়। আর স্থায়িত্বহীন জীবনের কথা স্মরণ করে নেক আমলে মনোযোগী হওয়া জরুরি। আল্লাহ যা সম্মানিত করেছেন, তা সম্মান করাই ইমানের দাবি।
শায়খ বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। তার মহিমা ঘোষণা করুন। তার দিকেই ফিরে আসুন। তার আনুগত্য করুন এবং তার অসন্তুষ্টির কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকুন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জিত কর্মের পূর্ণ ফল দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৮১)
হে মুসলমানরা! মুমিনের সবচেয়ে দামি অলংকার হলো তার সুন্দর আচরণ। আর সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো তীক্ষè অনুভূতি, অবিচল চেতনা, জাগ্রত হৃদয় এবং সচেতন বিবেক, যা মহান আল্লাহর হারামকৃত (সম্মানিত) বিষয়গুলোর পবিত্রতা অনুধাবন এবং সেগুলোকে সম্মান করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটিই সত্য ইমান, সুদৃঢ় বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণের স্পষ্ট প্রমাণ। এমন অনুগত বান্দারা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। তারা তাদের রবের সান্নিধ্যে পৌঁছানোর পাথেয় হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করে। মহান আল্লাহ যে বিষয়গুলোকে সম্মানিত করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘আশহুরে হুরুম’ বা পবিত্র মাসসমূহ। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কিতাবে মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে চারটি মাস হলো সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম কোরো না।’ (সুরা তওবা ৩৬)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসগুলোকে হাদিসে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। নবীজি (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, কালচক্র আপন গতিতে আবর্তিত হচ্ছে সেই দিনের মতো যেদিন আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছিলেন। বছর হলো বারো মাসে, যার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি হলো ধারাবাহিকভাবে জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। আর অন্যটি হলো রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থিত। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
নবীজি (সা.)-এর এই বর্ণনা ছিল মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য, যেখানে কোনো প্রকার আগ-পিছ করা বা কমানো-বাড়ানোর সুযোগ নেই। অর্থাৎ এখন শরিয়ত অনুযায়ী মাসের সংখ্যা এবং এর পবিত্রতা ঠিক তেমনি আছে যেমনটি মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন নির্ধারণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে জাহেলি যুগের সেই প্রথা বাতিল করা হয়েছে, যেখানে তারা পবিত্র মাসকে পিছিয়ে দিয়ে সফর মাসে নিয়ে যেত এবং নিজেদের ইচ্ছামতো মাসের পবিত্রতা পরিবর্তন করত।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয় কোনো মাসকে পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কুফরি বৃদ্ধি করে। এর দ্বারা কাফেররা পথভ্রষ্ট হয়, তারা এটি এক বছর হালাল করে এবং আরেক বছর হারাম করে, যাতে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তার সংখ্যা ঠিক রাখে। ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা তারা হালাল করে। তাদের মন্দ আমলসমূহ তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।’ (সুরা তওবা ৩৭)
এটি ছিল বিকৃতি, পরিবর্তন ও খেলাধুলার একটি রূপ, যা জাহেলি যুগে পরিচিত ছিল। এটি তাদের পথভ্রষ্টতা, কুফরি এবং মহান আল্লাহর আয়াত ও রাসুলদের অস্বীকার করার একটি বহিঃপ্রকাশ।
হে আল্লাহর বান্দারা! এই পবিত্র মাসগুলোর মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায় হলো এই সময়ে পাপাচার, অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়ে নিজের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকা। পাপ সবসময়ই মন্দ এবং এটি নিজের ওপর জুলুম করার নামান্তর। কারণ এটি মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর অবাধ্যতা। তবে পবিত্র মাসে এই পাপের ভয়াবহতা ও মন্দ প্রভাব আরও বেড়ে যায়। কারণ এটি একদিকে অবাধ্যতা ও তুচ্ছজ্ঞান করা, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সম্মানিত সময়ের অবমাননা। যেমন মক্কার হারামে গুনাহ করলে তার ভয়াবহতা বেড়ে যায় আল্লাহর এই বাণীর কারণে, ‘যে ব্যক্তি সেখানে জুলুমের মাধ্যমে অন্যায় করার ইচ্ছা করবে, আমি তাকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব আস্বাদন করাব। (সুরা হজ ২৫)
ঠিক তেমনি পবিত্র মাসেও গুনাহের বোঝা বেশি হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, আল্লাহ সব মাসের মধ্য থেকে চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং এগুলোর পবিত্রতাকে মহান করেছেন। এই মাসগুলোতে গুনাহ করা যেমন বড় অপরাধ, তেমনি নেক আমল ও এর সওয়াবও অনেক বেশি। কাতাদা (রহ.) বলেন, পবিত্র মাসগুলোতে জুলুম বা অন্যায় করা অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বড় গুনাহ, যদিও জুলুম সব অবস্থাতেই বড় অপরাধ। তবে আল্লাহ তার সৃষ্টি ও আদেশের মধ্যে যেটিকে ইচ্ছা মহান করেন।
হে আল্লাহর বান্দারা! যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসুল হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে, তার উচিত নিজেকে পাপাচার থেকে দূরে রাখা। নফসের খায়েশ, শয়তানের প্ররোচনা এবং মন্দ কাজের প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা। সবসময় মনে রাখা উচিত, জীবন হলো কয়েকটি পর্যায় বা মঞ্জিল মাত্র, যেখানে আয়ু শেষ হয়ে যায় এবং আমল বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ জানে না কখন তার বিদায়ের ঘণ্টা বাজবে। সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য উচ্চতর মাকাম অর্জনের চেষ্টা করে।
যে সময়টুকু পার হয়ে গেছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং অবশিষ্ট সময়কে নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত এটা লক্ষ করা যে, সে আগামীকালের জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।’ (সুরা হাশর ১৮)
হে আল্লাহর বান্দারা! পূর্বসূরি নেককার ব্যক্তিরা বলেছেন, মহান আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্য থেকে কিছু সত্তাকে বিশেষভাবে বেছে নিয়েছেন। যেমন তিনি মানুষের মধ্য থেকে রাসুল মনোনীত করেছেন। কথার মধ্যে তার জিকিরকে, জমিনের মধ্যে মসজিদসমূহকে, মাসের মধ্যে রমজান ও পবিত্র মাসসমূহকে, দিনের মধ্যে জুমার দিনকে এবং রাতের মধ্যে শবে কদরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ যা মহান করেছেন তাকে সম্মান করুন। কারণ বুদ্ধিমানদের কাছে বিষয়গুলো তখনই সম্মানিত হয় যখন মহান আল্লাহ সেগুলোকে সম্মান দেন।
হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহকে ভয় করুন এবং এই পবিত্র মাসের মর্যাদা রক্ষা করুন। আনুগত্যের পথে এগিয়ে আসুন এবং যা কিছু রাসুল (সা.) থেকে প্রমাণিত তা আঁকড়ে ধরুন। সব ধরনের বিদয়াত বা নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে দূরে থাকুন, যার কোনো ভিত্তি কোরআন ও সুন্নাহতে নেই। সেই ব্যক্তিই সফল যে মহান আল্লাহর সম্মানিত বিষয়কে সম্মান করে এবং নিষিদ্ধ বিষয়কে বর্জন করে।
হে আল্লাহর বান্দারা, আপনারা নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যেমনটি আপনাদের রব নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।
হে আল্লাহ, আপনি আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। চার খলিফা আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলি (রা.)-এর ওপর সন্তুষ্ট হোন। উম্মুল মুমিনিনরা এবং সমস্ত সাহাবি ও তাবেয়িদের ওপর রহমত নাজিল করুন। হে আল্লাহ, ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন। দ্বীনের সীমানাকে রক্ষা করুন। একত্ববাদী বান্দাদের সাহায্য করুন। মুসলিমদের অন্তরগুলোকে জুড়ে দিন এবং তাদের কাতারগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করুন। এই দেশসহ সমস্ত মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ ও শান্তিময় করে দিন।
হে আল্লাহ! মসজিদে আকসাকে মুক্ত করে দিন। ফিলিস্তিনের মুসলিমদের হেফাজত করুন। তাদের সাহায্যকারী ও সহায়ক হয়ে যান। হে মহিমাময়, আমাদের দুনিয়াকে সংশোধন করে দিন, যেখানে আমাদের জীবন অতিবাহিত হয়। আমাদের আখেরাতকে সুন্দর করে দিন, যেখানে আমাদের ফিরে যেতে হবে। আমাদের হায়াতকে নেক কাজের জন্য বৃদ্ধি করে দিন এবং মৃত্যুকে সব অনিষ্ট থেকে মুক্তির মাধ্যম বানিয়ে দিন।
হে আল্লাহ, আমাদের নফসকে তাকওয়া দান করুন এবং একে পবিত্র করুন, আপনিই এর সর্বোত্তম পবিত্রকারী। আমাদের সব কাজের শেষ পরিণতি সুন্দর করুন এবং দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের আজাব থেকে আমাদের রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, আপনার দেওয়া নেয়ামত চলে যাওয়া থেকে, আপনার দেওয়া সুস্থতা পরিবর্তন হওয়া থেকে এবং আপনার আকস্মিক আজাব ও অসন্তুষ্টি থেকে আমরা আপনার কাছে আশ্রয় চাই।
হে আল্লাহ! আমাদের রোগব্যাধি নিরাময় করে দিন, আমাদের মৃতদের ওপর রহম করুন এবং আমাদের নেক আশাগুলো পূরণ করুন। আমাদের আমলগুলো নেক কাজের মাধ্যমে শেষ করুন।
১ মে শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান