ঢাকা মহানগরী এলাকায় যান চলাচলে গত দুই-আড়াই বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। সড়কে পুলিশ যেখানে নিরুপায়, সেখানে সাধারণ মানুষও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে। এখন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হলে পুলিশের পাশাপাশি প্রায়ই সাধারণ মানুষকেও ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। এ প্রেক্ষিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। এর অংশ হিসেবে যানবাহনের পাশাপাশি সড়ক পারাপারে আইন লঙ্ঘন করলে পথচারীদের নামেও হবে মামলা-জরিমানা। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন অমান্যকারী পুলিশ সদস্য ও রাষ্ট্রের ভিআইপি গাড়িতে মামলা দিলে পুরস্কার ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা অমান্য করা প্রভাবশালী মহলের নিত্যকার ঘটনা। এ ছাড়া সড়কের পাশে গাড়ি পার্কিং করে যানজট সৃষ্টি করাও তাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই নিরুপায় ট্রাফিক সার্জেন্টরা। সেই অবস্থা এখন আর নেই, ডিএমপির কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশ ট্রাফিক আইন অমান্যকারী গাড়ির মালিক যেই হোক মামলা হবে।
গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আগের মতোই চলছে ট্রাফিক পুলিশ। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে পথচারীদের পারাপারেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। আবার ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়া পথচারীদেরও পারাপারে বাধা দিতে দেখা গেছে। তবে অনেকাংশে সতর্ক থাকছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। ভিআইপিদের গাড়ির ক্ষেত্রে কৌশলী সার্জেন্টরা। তারা ভিডিও মামলা করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক উপ-পুলিশ কমিশনার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পথচারী সিগন্যাল লাইট বসানো হয়েছে। তবে মামলার ক্ষেত্রে একটু সময় নেওয়া হবে। আগে সাধারণ পথচারীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরপর ধাপে ধাপে আইন প্রয়োগ করা হবে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক আইন অমান্য করার অপরাধে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ঢাকা মহানগর এলাকায় যানবাহনের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫৮ হাজার ৪২৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১ হাজার ৬১টি ও মার্চে ২৮ হাজার ৫৫০টি মামলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ৮ হাজার ৫১টি বাস, ৪ হাজার ৯৭৫টি ট্রাক, ৬ হাজার ৬৪টি কার্ভাডভ্যান, ১৩ হাজার ৮৫২টি প্রাইভেটকার, ১৫ হাজার ২টি কার/জিপ, ২ হাজার ৮১১টি মাইক্রোবাস, ৬ হাজার ৭১৪টি পিকআপ, ২৭৬টি হিউম্যান হলার, ৪৮টি ব্যাটারিচালিত আটোরিকশা, ৪৯ হাজার ৯৭৭টি মোটরসাইকেল ও ৩৬১টি অন্যান্য যানবাহনে মামলা করেছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া গেল এপ্রিল মাসের ১৬ দিনে ডিএমপির আটটি ট্রাফিক বিভাগ সড়ক আইন অমান্য করার অপরাধে ২৮ হাজার ৮৯টি মামলা করেছে। এই সময়ে তারা ৫ হাজার ৪৩২টি গাড়ি ডাম্পিং ও ২ হাজার ৭২০টি গাড়িতে রেকার বিল করেছে।
সম্প্রতি ট্রাফিক আইন অমান্য করার অভিযোগে পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিদর্শকের সরকারি গাড়িতে ভিডিও মামলা করে ট্রাফিক পুলিশ। পরে মামলার কপি আইজিপির নামে পুলিশ সদর দপ্তরে চলে যায়। ডিএমপির এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আইজিপি। পরে ওই পরিদর্শকের এক দিনের বেতন কর্তন করা হয়। এরপর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ট্রাফিক বিভাগে। ‘অন্যায় নিজে করব না, অন্যকে করতে দিব না’ এখন এই সেøাগানে চলছে পুলিশ।
ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত একাধিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমনিতেই অনেক সড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া ইউটার্ন করতে না দেওয়ায় বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। এরপর মামলা দেওয়ার কথা শুনলে তো...। এ জন্য ডিএমপি সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ভিডিও মামলা দেওয়া হচ্ছে এসব গাড়ির বিরুদ্ধে। পরে বাসায় মামলার কাগজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সার্জেন্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিশনার স্যারের নির্দেশে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোরভাবে কাজ করছে ট্রাফিক বিভাগ। তারপরও মাঝে মধ্যে ভয় হয়। মামলা করার নির্দেশনা থাকলেও কোনো ঝামেলা হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেন না। সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। পুলিশের আচরণে এ বিষয়ে পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এখনো কঠোর সতর্ক থাকতে হয়।
চলতি বছরের ১ মার্চ রাতে রাজধানীর গুলশান এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন বেআইনি সুবারু স্পোর্টস কার থামিয়ে তল্লাশি ও কাগজপত্র যাচাইয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গুলশান বিভাগের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। গাড়িতে ‘ডাক্তার নাহিয়র’ লেখা নেমপ্লেট ছিল। তল্লাশির সময় গাড়িতে থাকা ব্যক্তির পক্ষে বিদেশ থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেন। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি নিয়মিত বদলির অংশ। তারপরও বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক সদস্যদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। কার গাড়িতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আবার ঝামেলায় পড়তে হয় এমনটা বলছেন তারা।
ডিএমপি সদর দপ্তরের ঘোষণার পর থেকে ঝটিকা অভিযানে নেমেছে ট্রাফিক বিভাগ। প্রায় দিনই ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অভিযান করছে পুলিশ। এ সময় তারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বাস ও ট্রাকের বিরুদ্ধে সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরে দাঁড়ানো ও মাথায় হেলমেট না থাকার মামলা হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা মহানগরে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক আইনভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় শতভাগ আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে ম্যানুয়াল মামলা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে স্বয়ংক্রিয় মামলা পদ্ধতি চালু করতে হবে। এতে ঝুঁকি ও যানজট উভয়ই কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি যত্রতত্র পথচারী পারাপারের বিষয়ে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগটি ভালো হয়েছে। অনেক সময় পথচারীদের অসচেতনায়ও দুর্ঘটনা ঘটে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ এখন ডিজিটাল মামলার দিকে যাচ্ছে, যেখানে ভিআইপি ও পুলিশের গাড়িতে মামলা দিতে পারলেই পুরস্কার পাবেন সার্জেন্টরা। এ ছাড়া লাল বাতি, জেব্রা ক্রসিং, যত্রতত্র গাড়ি থামানো, উল্টো চলাচল ও বাম লেন ব্লক করলেই মামলার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় যত্রতত্র পারাপার করলে পথচারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত নেওয়া হবে। সোনারগাঁও ও গুলশান-২সহ ১৬টি স্থানে পথচারীদের উদ্দেশে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া শাহবাগসহ রাজধানীর অনেক সড়কে পথচারী পারাপারে সিগন্যাল লাইট বসানো হয়েছে। সবুজ বাতি জ¦লার আগে কোনো পথচারী রাস্তা পার হলেই মামলা-জরিমানা করা হবে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক এডুকেশন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।
