সন্তান মানুষ হয় পরিবারে। কিশোর বয়সের আগেই পরিবারে সন্তানের ভালো মানুষ হওয়ার ভিত্তি তৈরি করুন। ভালোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় নিয়োজিত করুন। শুধু পরীক্ষার খাতায় একশ চাই, এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, বড়দের কীভাবে সম্মান করতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন মন্তব্য করতে হবে, এসব ছোট থেকেই হাতেকলমে দীক্ষা দিন। সন্তানের আচার-আচরণ ও কথাবার্তা কেমন হওয়া উচিত, ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন ধারা অনুসরণ করা দরকার, সেটার প্রশিক্ষণ দিন। তখন অভিভাবক হিসেবে সফল হবেন।
অনেক অভিভাবক নিজের স্বপ্নপূরণে শিশুকে অসময়ে অনেক বেশি শিখিয়ে ফেলতে চান। বাড়তি এ ভার আরোপের ফলে শিশুকে হতাশায় পেয়ে বসে। ফলে তার মধ্যে জন্ম নেয় না পারার বোধ। অথচ অগ্রগামিতার জন্য আত্মবিশ্বাস অতি জরুরি। প্রত্যেক শিশুর মধ্যে নিজস্ব প্রতিভা সুপ্ত থাকে। কারও বিকাশ জলদি ঘটে, কারও ঘটে ধীরে। তাই তুলনামূলক বেশি মেধাবীর সঙ্গে শিশুদের কখনো তুলনা করতে নেই। অমুকের সন্তান পারে, তুমি কেন পারো না? এটা বলে সন্তানকে তিরস্কার না করে বরং উৎসাহ প্রদান করা চাই। মাশাআল্লাহ! সুন্দর হয়েছে, তুমি দেখি সব পারো, তোমাকে আরও ভালো করতে হবে। এ ধরনের কথা বলে শিশুর মনে আত্মবিশ্বাস জাগাতে হবে।
শিশুর নৈতিক শিক্ষার সব ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তার দুনিয়া ও আখেরাত কল্যাণকর হয়। সন্তানকে শিষ্টাচার শেখাতে হবে, যাতে তার আচার-আচরণ সুন্দর হয় এবং সমাজে সবার ভালোবাসা ও সহানুভূতি লাভ করে। সন্তানকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ বোঝাতে হবে, যাতে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সন্তানদের নিরাপদ ও আনন্দময় জীবনের জন্য পিতা-মাতাকে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
পাশের ঘরে মেহমান আসলে লুকিয়ে তাদের আসার উদ্দেশ্য উদঘাটন করা, অগোচরে থেকে তাদের নিজস্ব আলাপ শ্রবণ করার বদ অভ্যাস অভিভাবকদের ছাড়তে হবে। কেউ তার নিজস্ব বিষয় নিজে থেকে প্রকাশ না করলে যেচে পড়ে সেটা জানা যে অভদ্রতা, এটা সন্তানদের শেখাতে হবে। অন্যের জিনিস বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা তো দূরের কথা, স্পর্শ করাও অন্যায়, এই বোধ সন্তানের মনোজগতে তৈরি করতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান। অসহায় মানুষ ও প্রাণীদের জন্য কিছু করতে উৎসাহ দিন। বাবা হয়তো আর্থিক সহায়তা করছেন কাউকে কিংবা কোনো ভিক্ষুককে খাবার দিচ্ছেন, এই কাজটুকুই সন্তানের হাত দিয়ে করান। পথের প্রাণীদের ভালোবাসতে শেখান, তাহলে শিশুর মনটা উদার হবে।
অন্যের প্রতি সম্মানবোধের প্রথম শিক্ষাটা শিশু পরিবার থেকেই পায়। শিশুর সামনে কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করবেন না। কেউ খাটো, কেউ লম্বা, কেউ ফর্সা, কেউ কালো, কাউকেই ছোট করে দেখতে নেই, মনে আঘাত দিয়ে কথা বলতে নেই। ছোট থেকেই এসব স্বাভাবিক বিষয় অঙ্কুরিত করে দিন সন্তানের মনে।
এমন ঘর খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে বাবা-মা সন্তানের সামনে অন্যদের বদনাম, পরনিন্দা, দোষচর্চা করেন না। পাড়া-মহল্লার কোন পরিবারের কোন ছেলে উশৃঙ্খল আর কোন মেয়েকে জিনে ধরা, এ জন্য বিয়ে হচ্ছে না এসব নিয়ে থাকে পারিবারিক গল্পের আসর। গ্রামের অমুক কোনো কাজের না, অমুকে টাকা মেরেছে, অমুককে দেখলে ঘৃণা হয়, তমুকের দাঁত দেখলে বমি আসে, এসব কথা পরিহার করতে হবে।
শৈশবকাল থেকেই সন্তানকে ভালো মানুষের সঙ্গে মিশতে দিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি মানবতা, আদর্শ, সৎ চরিত্রবান ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার জন্য সহযোগিতা করতে হবে অভিভাবক হিসেবে। প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, উপলব্ধি করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তবেই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠবে। এ দায়িত্ব শৈশব থেকেই অভিভাবককে নিতে হবে।
মূলত সন্তানকে মানুষ করার আগে অভিভাবককে নতুন করে মানুষ হয়ে বাঁচার দায়িত্ব নিতে হবে। ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সন্তান বাবা-মাকে দেখে শেখে। ওরা অনুকরণ করে। অভিভাবকের ভালো অভ্যাস, আচরণ যেমন তাদের মধ্যে ইতিবাচক গুণের বিকাশ ঘটায়, তেমনই খারাপ অভ্যাসের প্রভাবও তাদের ওপরে পড়ে। সেই কারণেই দেখা যায়, মা-বাবার ভালো-খারাপ দুই আচরণই সন্তানরা তাদের অজান্তেই রপ্ত করে ফেলে। শিশুর মধ্যে ভালো অভ্যাস গড়তে হলে বাবা-মায়ের আচরণে নজর দেওয়া দরকার, অথচ অভিভাবকরা সার্টিফিকেটের সফলতার পেছনে ছুটছেন, বেয়াদব, অসভ্য হয়ে হলেও সে যেন কাক্সিক্ষত সার্টিফিকেটের সফলতা আনে। এমন মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
‘চাইল্ড এভিইউজ’ এখন বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এটি খুবই সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদেরকে এই বিষয়ে অবগত করা অতীব জরুরি। কোন স্পর্শের কী অর্থ তা বোঝানো, অপরিচিতদের সঙ্গে কোথাও না যাওয়া, কার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক এসব সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত করা সব অভিভাবকের অবশ্য করণীয়। সুতরাং আদর করার ফুরসতে বাচ্চাদের গালে বা স্পর্শকাতর অঙ্গে কেউ যাতে স্পর্শ না করে, এ জন্য বাচ্চাকে ছোট থেকে শেখাতে হবে। মায়ের প্রতি বাবার আচরণ দেখে সন্তান সামাজিক পরিসরে নারীর অবস্থানের প্রাথমিক ধারণা পায়। মা-বাবার দাম্পত্যজীবন পরবর্তীকালে তার দাম্পত্যজীবনেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কন্যাশিশু পরবর্তী জীবনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে কিংবা শ^শুরবাড়িতে গিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে। স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক হিসেবে আপনার সন্তান বেড়ে উঠুক, এমনটা নিশ্চয়ই চাইবেন না। তাই সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলুন, পারিবারিক সম্প্রীতি বজায় রাখুন।
মা-বাবাই সন্তানের আদর্শ। সসময় আপনার সন্তানের সঙ্গে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। অভিভাবকরা শিশুর মূল্যবোধ ও লক্ষ্য স্থির করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তবে মনে রাখবেন, যে লক্ষ্য শিশুর জন্য স্থির করেছেন, তা যেন আকাশের চাঁদ না হয়ে দাঁড়ায়। অভিভাবকরা অবশ্যই জীবনসংগ্রামের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে সন্তানকে সাহায্য করবেন এবং তাদের মধ্যে আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করবেন।
বড়দের শ্রদ্ধা করার বিষয়টি সন্তানদেরকে বোঝাতে হবে। সন্তানের সামনে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যা থেকে শিশুর মনে নেগেটিভ ধারণার জন্ম নেয়। তাদের সামনে যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি মা-বাবার অবশ্যই চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। কারণ আগের মতো সন্তানরা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গ তেমন একটা পায় না। কারণ ছেলেমেয়েরা এখন ব্যস্ত অনলাইনে। তাই সবার আগে অবশ্যই নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তান যেন পরিবারকে আপন ভেবে সবকিছু শেয়ার করে সেই জায়গাটা তৈরি করতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কতক্ষণ সময় ব্যয় করছে, এগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে যে সবার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে, এটা সময়মতো ছেলেমেয়েদের জানিয়ে রাখতে হবে। যেন ওরা নিজের পরিবর্তনের সঙ্গে অভিভাবকদের কথাগুলো মেলাতে পারে।
শিশুরা কেমন করে উন্নত চরিত্র ও আদর্শের অধিকারী হতে পারে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের মনোযোগী হতে হবে। শিশুদের আদর্শবাদী করে গড়ে তুলতে না পারলে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। শিশুদের চরিত্র গঠনে অভিভাবকদের সদা সচেতন থাকা প্রয়োজন। নরম কাদা মাটিসদৃশ শিশুরা শৈশবে যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার প্রভাব তার জীবনে স্থায়ী হয়ে যায়। এ জন্য মা-বাবাকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব দিয়ে এবং ধর্মীয় নির্দেশনার মাধ্যমে সন্তানদের প্রতিপালন করতে হবে। অভিভাবকদের সার্বিক সহযোগিতা সন্তানদের জন্য কাক্সিক্ষত কল্যাণ বয়ে আনবে। তাই শিশুদের জন্য যতœবান ও মনোযোগী হওয়া মা-মা-বাবার অপরিহার্য ও নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : ইমাম ও খতিব মাদানি জামে মসজিদ, কিডিরমিনিস্টার, বার্মিংহাম, ইউকে
