তরুণদের সামনে এনে জামায়াতের নতুন ছক

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তরুণ প্রার্থী বেছে নিচ্ছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। সিটি করপোরেশনের মেয়র থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পর্যন্ত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তরুণ নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এমনকি ছাত্রশিবির থেকেও প্রার্থী করা হচ্ছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ড. হাফিজুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মহানগর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তা ছাড়া সারা দেশে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও চলছে।

এসব প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ছাত্রশিবিরের সদ্য সাবেক নেতাদের গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। বিশেষ করে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের সামনে নিয়ে আসার বিশেষ ছক কষে এগোচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৮টির প্রার্থী প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। বাকিগুলোর প্রার্থী ঠিক করার কাজ চলছে।

জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচনে মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সাদিক কায়েম রোকনদের (সদস্য) সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। সে হিসাবে প্রাথমিকভাবে এই দুজনকেই প্রার্থী হিসাবে ঠিক করা হয়েছে।

ডিএসসিসির মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা জামায়াতের রাজনীতিতে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ছাত্রশিবির জামায়াতের ছাত্র সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত হলেও দুই সংগঠনের গঠনতন্ত্রে তাদের সম্পৃক্ততার কোনো উল্লেখ নেই। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে শিবির নেতাকে বেছে নেওয়ার পর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলে শিবিরের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রতিবাদলিপিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘তাদের সংগঠনে নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।’ এ বিষয়ে সাদিক কায়েমের অবস্থান জানার জন্য গতকাল মোবাইল ফোনে কল ও ম্যাসেজ পাঠানো হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করতে আরও অন্তত ৬ মাস সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে সাদিক কায়েম ছাত্রত্ব শেষে জামায়াতে যোগ দেবেন। তখন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবে দলটি।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তরুণতম নেতাকে বেছে নিয়েছে দলটি। তুরস্কের তোকাত গাজি ওসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমানকে গত বুধবার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। তিনি এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ও তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে মাস্টার্স করার পর তুরস্ক সরকারের স্কলারশিপে আঙ্কারার গাজী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। ‘এরদোয়ান : দ্য চেঞ্জ মেকার’ বই লিখে বেশ জনপ্রিয়তা পান তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের নতুন আসনে (গাজীপুর-৬) প্রার্থী করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশে এই আসনটি বাতিল হলে তাকে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য করা হয়। এই নির্বাচনে জামায়াতের ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ড. হাফিজ।

জামায়াত নেতারা বলছেন, দলের মধ্যে তরুণ যোগ্য নেতাদের সামনে নিয়ে আসার কাজ আরও আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একঝাঁক তরুণ নেতাকে প্রার্থী করা হয়েছে। যারা ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। এর মধ্যে ২০২১ সালে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাউদ্দিন আইউবী ও ২০২২ সালের সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, মঞ্জুরুল হক রাহাত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তা ছাড়া আরও অনেক তরুণ প্রার্থী ছিলেন, যারা অল্প ব্যবধানে পরাজিত হলেও এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, এক সময় দলের রুকন বা বড় দায়িত্বশীল না হলে কোনো পর্যায়ে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতো না। কিন্তু সেই ধারা থেকে এবার বেরিয়ে আসছে দলটি। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্মী-সমর্থক, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী থেকে এমপি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যদিও নারী প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়া নিয়ে এখনো সমালোচিত হচ্ছে দলটি। তারা এ নিয়েও কাজ করছেন বলে জানাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিভিন্ন কূটনৈতিক মিটিংসহ কর্মসূচিতে দলের নারী নেত্রীদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে এগুলোও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে সুরাহা করছে দলটি। অনেক প্রবীণ নেতার নামে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগ ছিল। সময়ের ব্যবধানে এমন নেতৃত্ব দলটিতে কমে আসছে। এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সামনে এনে রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিতে চাচ্ছে জামায়াত।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমি জামায়াত আমিরের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সে সময় তাকে দুটি বিষয় নিয়ে ইমেজ প্রবলেমের কথা বলেছি। একটি একাত্তর, অপরটি নারী। তিনি আমাকে আশ^স্ত করে বলেছেন, তারা দুটি বিষয় নিয়েই কাজ করছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে তো বটেই, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের বিপুলসংখ্যক নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।’

দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, ‘ক্ষমতার কেন্দ্রে রাজনীতি করতে হলে নিজেদের অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। যেমনটি করেছে তুরস্কের মুসলিম ব্রাদারহুড। তাদের পরিবর্তনে অবশ্য ২০-২৫ বছর সময় লেগেছে। জামায়াত মুসলিম ব্রাদারহুডকে ফলো করে তাদের রাজনৈতিক সংস্কার আনতে পারলে ভালো করবে।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তরুণদের প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির ও মেয়র প্রার্থী মাওলানা আব্দুল জব্বার। তিনি ছাত্রশিবিরের ২০১৪-১৫ সালে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। বাছাইয়ের কাজ চলছে। মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারুণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কাজ করার সক্ষমতা ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ঠিক করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

ডিএসসিসির জন্যও একঝাঁক তরুণ কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাই করেছে জামায়াত। দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমনকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী করা হয়েছে। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে মুতাসিম বিল্লাহ এবং রবিউল ইসলামের মতো তরুণ নেতাদের প্রার্থী করা হচ্ছে। জানতে চাইলে আব্দুস সাত্তার সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় সব ওয়ার্ডেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে সবাই নানা সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন।

ডিএনসিসির মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এরই মধ্যে সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচিসহ ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় তার প্রচারণামূলক ফেস্টুনও চোখে পড়ছে। তা ছাড়া কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীও ঠিক করেছে দলটি। কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নানা কর্মকা- পরিচালনা করছেন তিনি। মহানগর উত্তরের এক নেতা জানিয়েছেন, এবার দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের বেশিরভাগই তরুণ। ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী করা হয়েছে অ্যাডভোকেট মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিককে। ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে অ্যাডভোকেট এম জে ফারুক এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নাসির উদ্দিন খানের মতো নবীন প্রার্থী রয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য নগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালীকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শুলকবহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি। তরুণদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকে। তাদের সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগানো গেলে, আমরা জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারব। তাই শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়, গত সংসদ নির্বাচনেও আমরা তরুণদের প্রাধান্য দিয়েছি। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তরুণ মেধাবী ও সৃজনশীল নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। স্থানীয়ভাবে অনেক জায়গায় ঘোষণা হচ্ছে। এগুলো প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু যাচাই-বাছাই শেষে কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত